আন্তর্জাতিক

পুনর্বাসন

নেইলি ক্যরামেলি
নেইলি ক্যরামেলি 08 Mar, 2026
২৪
স্প্লিটের উপকণ্ঠে থাকি, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি অ্যাপার্টমেন্টে, যদিও আমার সমুদ্র দেখার সময় খুব কমই হয়। অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, লবণ আর পাইন গাছের সুগন্ধে ভরা, কিন্তু আমার জীবন প্রায়ই তাড়াহুড়োয় তৈরি কফি আর রুটির গন্ধে ভরা।
 
    সপ্তাহের শেষ দিনটি পর্যন্ত আমাকে সবসময়ই তাড়াহুড়োয় বাঁচতে হয়। তারা বলে সমুদ্র তোমাকে শান্ত করে। কিন্তু আমার কাছে, সাগর  মনে করিয়ে দেয় যে সবকিছুর  বিশালতা, আর কতবার আমি সেই বিশালতার মধ্যে একা থাকি।
 
    আমি একা তিন সন্তানকে বড় করছি, দুই ছেলে এবং একটি মেয়ে। বড় ছেলেটির চোখে ইতিমধ্যেই এমন একটা গম্ভীর্য আছে যা তার বয়সের সাথে একেবারেই মেলে না।
 
    ছোট ছেলেটি অস্থির, প্রশ্নে ভরা।  এখনও বিশ্বাস করে যে পৃথিবীর সহজ উত্তর আছে। আমার মেয়েটি সবচেয়ে বড়, শান্ত ভদ্র। যার হাসি মাঝে মাঝে আমাকে কষ্ট দেয়, কারণ আমি জানি যে আমি সেই হাসির মধ্যে থাকার জন্য কতটা লড়াই করি।
 
    প্রতিটি সকাল একইভাবে শুরু হয়। আমি তাদের সামনে ঘুম থেকে উঠি, গোটা স্প্লিট এখনও অর্ধঘুমন্ত। শহরটি সবেমাত্র প্রসারিত হতে শুরু করেছে। বারান্দা থেকে আমি সূর্যকে ধীরে ধীরে সমুদ্র স্পর্শ করতে দেখি, দেখি পাথরের সম্মুখভাগ এবং ডায়োক্লেটিয়ানের প্রাসাদের দেয়াল থেকে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।
 
    মুহূর্তটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এটি আমাকে এমন অনুভূতি দেয় যে আমি এখনও এই শহরের অংশ, যদিও প্রতিদিন এই শহর আমাকে নিঙড়ে ফেলে।
 
    যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় আমার বয়স বিশের  প্রথম ঘরে। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই আমার নিজেকে বৃদ্ধ মনে হত। আমার জন্ম মিশ্র বিবাহে - আমার বাবা ছিলেন একজন খ্রিস্টান, আমার মা ছিলেন মুসলিম - এবং যুদ্ধ শুরুর আগে পর্যন্ত এগুলি ছিল জীবনের সহজ সাধারণ গুরুত্বহীন তথ্য। যুদ্ধের সময় এই গায়ে না মাখার মত তথ্যটিই সামাজিক ভ্রূকুটির মত বিপদসংকুল প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে আমাদের গায়ে ঝুলে পড়ে।
 
    যুদ্ধের আগে, এগুলি ছিল নিতান্ত স্বাভাবিক বিষয়। যুদ্ধে, এগুলি  হয়ে ওঠে বিপদ।
 
    আমি একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ করতাম। ১৯৯২ এর এপ্রিলের কোনও এক দিনে সারায়েভো জেগে উঠল ভারী সেল আর মর্টারের গোলার শব্দে। শিক্ষা দ্রুত বন্ধ হল এবং রাতারাতি সেটি হয়ে উঠলো একটি অস্থায়ী ওয়ারশেল্টার, কখনও কখনও আহতদের জন্যও। 
 
    শিশুরা ফিসফিসিয়ে কথা বলতে শিখেছিল। তারা বুঝেছিল নীরবতা মানে নিরাপত্তা। তারা খালি পায়ে, ক্ষুধার্ত, অনেক কিছু দেখেছে এমন দৃষ্টি নিয়ে আসত। আমি তাদের চিঠি লিখতে শিখিয়েছিলাম যখন চারিদিকে ভীষণ বিস্ফোরণ হচ্ছিল।
 
    আমি তাদের গণিত শিখিয়েছিলাম যখন তারা গোলাগুলি গণনা করছিল। কখনও কখনও আমি তাদের  মাঝখানে থামিয়ে দিতাম যখন দেয়াল কাঁপত এবং ছাদ থেকে বলকানের তুষারপাতের মতো ধুলো পড়ত।
 
    এখন আমি যখন-যেমন তখন-তেমন কাজ করি। মৌসুমি কাজ, ক্লিনিং এর কাজ, মাঝেমধ্যে পার্টিগুলির রান্নাঘরের কাজ, কখনও কখনও বা একই দিনে দুটি কাজও।
 
    গ্রীষ্মকাল এখানে অনেক সহজ, হয়তো একই সাথে কঠিনও। এড্রিয়াটিকের পাড় তখন বিশ্রামে নিতে আসা মানুষে ভর্তি। গ্রীষ্মে গমগম করে স্প্লিট শহর। আমি তখন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় আর ইউরো গুনছি। শীতকালে, স্প্লিট শান্ত নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে, এবং সেই নিস্তব্ধ নীরবতা মৃত্যুর মত ভারী, ঠান্ডা,  হুমকিস্বরূপ।
 
    শীতকাল আমাকে 'স্নাইপার এলি'র কথা মনে করিয়ে দেয়। স্নাইপার এলি আসলে সারায়েভোর একটি প্রধান রাস্তা, যার নাম বসনিয়ান নাম  'যাম্জা অদ বসনে স্ট্রীট'। আমরা শুনতাম মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া যায় কিন্তু স্নাইপার এলির স্নাইপারদের নয়। সেখানে স্নাইপাররা ছিল  সারায়েভোর সাধারণ মানুষের মৃত্যুর অদৃশ্য দেবতা।
thescroll.in
    আমি দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে হাঁটতে শিখেছি, না তাকিয়ে রাস্তা পার হতে শিখেছি, বুকের সামনে বই জড়িয়ে চলতে শিখেছি যেন তারা আচমকা ছুটে আসা বুলেট থামাতে পারে। আমি এক ধাপের মাঝখানে গুলিবিদ্ধ মানুষ পড়ে থাকতে দেখেছি। আমি দেখেছি রুটি ভর্তি শপিং ব্যাগ ডামারের উপর পড়ে আছে, ধীরে ধীরে তাদের চারপাশে রক্ত ​​ছড়িয়ে পড়ছে।
 
    কিছু ছবি কখনও আপনাকে ছেড়ে যায় না। তারা আপনার ভিতরে  মিশে যায় এবং আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের অংশ হয়ে ওঠে।
 
    আমার সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়, ক্লান্তি নয়, অনিশ্চয়তা। বাচ্চাদের স্কুলের বইয়ের জন্য কীভাবে ইউরো জোগাড় করব, এই বছর কেন কোনও স্কুল ট্রিপ নেই তা কীভাবে তাদের অভিমানী চোখের সামনে ব্যাখ্যা করব, কীভাবে বলব যে নতুন স্নিকার্সের জন্য আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
 
    আমার বাচ্চাদের স্কুলে, আমি অন্য বাবা-মায়ের দিকে খুব বেশি নজর না দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি সবসময় ভাবি যে তারা কি দেখতে পাচ্ছে যে আমি কতটা ভারসাম্যহীন।
 
    সন্ধ্যাবেলায়, যখন বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে, আমি দূর থেকে সমুদ্রের শব্দ শুনি। ঢেউগুলো আমার চিন্তাভাবনার সাথে একই ছন্দে তীরে আঘাত করে। আমি ভাবি আমি কি যথেষ্ট? একদিন আমার সংগ্রাম তাদের কাছে কিছু অর্থ বয়ে আনবে কিনা, নাকি তারা কেবল সেই জিনিসগুলোই মনে রাখবে যা আমি তাদের দিতে পারিনি।
 
    অসহায়ত্ব! আপনি জানেন এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা পৃথিবীতে আর কিছু নেই। অসহায় আমি আমার ছাত্রদের রক্ষা করতে পারিনি। একজন মেয়ে হিসেবে আমি আমার বাবাকে নিরাপদ কোথাও নিয়ে যেতে পারিনি। একজন মানুষ হিসেবে আমি প্রতিদিন বেঁচে ছিলাম যখন অন্যরা তা পারেনি।
 
    রাতে, আমি নীরবে কাঁদতাম যাতে আমার বাবা শুনতে না পান। আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করতাম যে এই যুদ্ধে ঈশ্বর ঠিক কোন পক্ষে। আর ঈশ্বর যদি পক্ষপাতদুষ্ট না হন তাহলে একজন স্নাইপার যখন একটি শিশুকে গুলি করছিল তখন তিনি ঠিক কোথায় ছিলেন। আমার বিশ্বাস তখন খ্রিস্টান বা মুসলিমের কোন আলাদা ঈশ্বর ছিল না - খালি এটি বিশ্বাস করার মরিয়া প্রয়োজন ছিল যে এই যুদ্ধ চিরকাল স্থায়ী হবে না।
 
    আমার মুসলিম মা এবং ভাইয়েরা নিজ দেশ থেকে চোরের মত নির্বাসনে চলে গেলেন। খুব বেশি কথা হয়নি হঠাৎ করেই তাদের চলে যেতে হল। খুব অল্প সময়ের জন্য আলিঙ্গন, এমন এক দৃষ্টি যা আমরা জোরে বলতে ভয় পেতাম। আমি আমার খ্রিস্টান বাবার সাথেই থেকে গেলাম। তিনি সবসময় একজন শান্ত মানুষ ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ তাকে আরও শান্ত করে তুলেছিল।
 
    আমরা রুটি, ভয় এবং নিদ্রাহীন রাত ভাগ করে নিতাম। ১৯৯৪, ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে সার্বরা যখন মার্কালে মর্টার হামলা ও গণহত্যা শুরু করল এবং গোলাগুলি যখন আরো কাছে এলো, তখন আমরা অন্ধকারে বসে পরস্পরের হাত ধরে রক্তাক্ত শহরকে অনুভব করছিলাম।
 
    কাগজে কলমে একদিন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল, কিন্তু চলতে থাকল আমার ভেতরে। এত বছর কেটে গেল, তবুও গুলির শব্দ এখনও আমাকে পিছনে নিয়ে যায়। আমি এখনও ধোঁয়ায় ভরা স্কুল করিডোরটিকে স্বপ্নে দেখি। আমি এখনও সেইসব শিশুদের নাম মনে রাখি যারা কখনও বড় হয়নি।
thescroll.in
    আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, কিন্তু বেঁচে যাওয়া আর বেঁচে থাকা তো এক জিনিস নয়।
 
    আমার শক্তি নেই, আমি সাহসী নই। কিন্তু প্রতিদিন আমি হাতে মুদিখানার ব্যাগ নিয়ে রিভা নদী ধরে হাঁটছি, জাহাজ আসা-যাওয়া দেখছি, আমি জানি আমি থামতে পারছি না। স্প্লিট পাথর এবং সমুদ্রের একটি শহর - একই সাথে কঠিন এবং সুন্দর। সম্ভবত আমিও তেমনই।
 
    বাচ্চারা কথার চেয়ে বেশি অনুভব করে। আমার বড় ছেলেটি জিজ্ঞাসা না করেই দায়িত্ব গ্রহণ করে। ছোট ছেলেটি প্রায়শই আমাকে জড়িয়ে ধরে, যেন আমি এখনও এখানে আছি কিনা তা পরীক্ষা করে নেয়। আমার মেয়ে রাতে ফিসফিস করে বলে যে সে আমাকে ভালোবাসে, এবং সেই কথাগুলো জাহাজের নোঙরের মতো আমাকে ধরে রাখে।
 
    ১৯৯৮ সালে, আমি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। স্মৃতি, শোক এবং আমার বাকি আশা টুকু নিয়ে আমি ক্রোয়েশিয়ায় চলে আসি। আমি সব ভুলতে চেয়েছিলাম বলে নয়, বরং আমার এমন একটি জায়গার প্রয়োজন ছিল যেখানে জীবন আবার শুরু করা যেতে পারে।
 
    স্প্লিট ক্রোয়েশিয়ার একটি শান্ত শহর। একাকীত্ব শান্ত, কিন্তু শূন্য নয়।
 
    আর যখন অ্যাড্রিয়াটিকের সমুদ্র প্রতি সন্ধ্যায় গভীর নীল নীরবতায় ডুবে যায়, তখন আমি নিজেকে গতকালের মতোই প্রতিশ্রুতি দিই—আগামীকাল আমি আবার জেগে উঠব, কারণ আমার বাচ্চারা এখানে, সমুদ্রের ধারে, এবং তারা বিশ্বাস করার যোগ্য যে জীবন কেবল বেঁচে থাকার চেয়েও বেশি কিছু হতে পারে।
নেইলি ক্যরামেলি

নেইলি ক্যরামেলি

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।