ফিচার
অঙ্ক ভূত ও ওঝার গল্প
'ভূত', বাস্তবে যার অস্তিত্ব না থাকলেও আপামর জনসাধারণের মনে এর উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। ভূতের প্রধান কাজ হল ভয় দেখানো। যেসব ভূতকে মানুষ ভয় পায় না, ভূত সমাজেও তাদের কদর কম।
কিছু আঞ্চলিক ভূত আছে যাদের বিচরণ ক্ষেত্র গ্রাম বাংলাতেই সীমাবদ্ধ। শহরের জনতা এদের বিশেষ পাত্তা দেয় না; যেমন- ব্রহ্মদৈত্য, মামদো শাকচুন্নি পেত্নী ইত্যাদি। আবার নবাবী ভূত সাহেব ভূত প্রভৃতি ভূতের বিচরণ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেই গোচরে আসে।
আবার আন্তর্জাতিক ভূত হিসেবে 'ড্রাকুলা'-র প্রতিপত্তি অনেক দেশেই লক্ষ্য করা যায়। ভূত সমাজের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বাংলায় যেমন 'ভূতচতুর্দশী' পালন করা হয়, তেমনি বিদেশেও তেমনি 'হ্যালোইন' দিবস উদযাপন করা হয়।
তবে, আজ আমি যে ভূতের কথা শোনাবো তাকে গোটা পৃথিবীর সব মানুষই কম-বেশি ভয় পায়। সে হল অঙ্কের ভূত। সেই ছোট্টবেলা, যখন থেকে আমরা লেখাপড়া শুরু করি, তখন থেকেই বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাও এই ভূতের ভয় দেখানো শুরু করে।
যার প্রমাণ আমরা বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'গোঁসাই বাগানের ভূত' গল্পে দেখতে পাই। যেখানে ছোট্ট শিশু বরুণকে সবাই একই সুরে বলে "বরুণ তুমি অংকে তেরো"। যার ফলে অঙ্ক ভূতের ভয় বরুনের শিশুমনে জাঁকিয়ে বসে।
শুধু এখানেই নয়, সাহিত্যে যখনই অঙ্ক বা অঙ্ক শিক্ষকের প্রসঙ্গ এসেছে, সেখানেই এই বিষয়ে একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ব্যবহৃত 'জটিল', 'রসকষহীন', 'দুর্বোধ্য' শব্দগুলি নিঃসন্দেহে পাঠকের মনে গণিতের প্রতি ভয় বৃদ্ধি করেছে।
তাহলে দেখা যাক বয়সের বিভিন্ন স্তরে কাকে, কখন, কিভাবে অঙ্কের ভূতে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে এই ভূতের ভয় দূর করার মহামন্ত্রই বা কি, তাও বিশ্লেষণ করা যাক-
প্রাথমিক ভূত
ছোট ছোট শিশুদের মনে সাধারণত ভয়ের অনুভূতি থাকে না। তাই তারা খুব সহজেই খেলতে-খেলতে ছড়ার মাধ্যমে 'অ-এ অজগর' বা 'A for Apple' অথবা '১-এ চন্দ্র' সহজেই শিখে ফেলে। কিন্তু গোল বাধে তার পরেই। যখন বাস্তব অভিজ্ঞতা হওয়ার আগেই আমরা তার মনে 'ছোট সংখ্যা' ও 'বড় সংখ্যা'র ধারণা গুঁজে দিতে চাই।
বেশি খাবার বা বড় খেলনা সে সহজে চিনতে পারলেও, একই আকারের "কালো" সংখ্যাগুলির ক্ষেত্রে ছোট বড় নির্ণয় তার কাছে সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। "তোমার কাছে একটা লজেন্স ছিল, দাদা আরও একটা লজেন্স দিলে তোমার কটা লজেন্স হল" অথবা "তোমার তিনটে খেলনার মধ্যে একটা খেলনা ভাইকে দিলে, তোমার কটা থাকলো" -এই জাতীয় সরল যোগ ও বিয়োগের ধারণা দিতে আমরা যে সময় ব্যয় করি সে তুলনায় "তিন সাততে এর একুশ" -এর ধারণা দিতে আমরা ততটা সময় খরচ করি না।
এর ফলে 'গুণের নামতার' মধ্যে দিয়েই শিশুমনে গণিত আতঙ্কের ভিত্তি প্রস্তুত হয়। বাংলা বা ইংরেজি ছড়ায় ব্যবহৃত শব্দগুলোর সাথে শিশু তার বাস্তব জীবনের মিল খুঁজে পায় বলে তা সহজেই মনে রাখতে পারে। কিন্তু গুণের নামতার ক্ষেত্রে, সে তার বাস্তব জীবনের ক্রিয়া-কলাপের সঙ্গে এর কোন মিল খুঁজে না পাওয়ায় তা সহজে মনে রাখতে পারে না।
প্রাথমিক ভূত তাড়ানোর উপায়
বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে 'যোগ-বিয়োগে'র ধারণা দৃঢ় করা উচিত। গুণের নামতা মুখস্ত না করে বরং নামতা গঠন করতে শেখানো উচিত। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত শব্দ, যেমন- 'ঘন্টা-মিনিট', 'টাকা-পয়সা', 'দিন-মাস-বছর' ইত্যাদির আন্তঃসম্পর্ক উপলব্ধি করতে শেখানো প্রয়োজন।
আর 'ডজন' 'দিস্তা' প্রভৃতি শব্দের মধ্যে যে গণিত লুকিয়ে আছে তা শেখালে গুণের নামতা বোঝানোটা অনেক সহজ হয়। শিশুরাও সক্রিয়তার মাধ্যমে শিক্ষণ লাভ করে। মনে রাখতে হবে যে অঙ্ক শেখার প্রথম শর্তই হলো গণনায় দক্ষতা লাভ করা। শিশু গণনায় যত দক্ষ হবে তার গণিত ভীতি ততটাই কমবে।
শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শিক্ষিকারা যদি প্রাথমিক শ্রেণীর শিশুদের প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা গণনা করানো অভ্যাস করান, তবে দেখা যাবে প্রথম দিকে এক-দুই-তিন.. এভাবে গুনতে গুনতে পরে নিজেরাই নিজেদের কাজ সহজ করার তাগিদে বেঞ্চ সংখ্যা ও প্রতিবেঞ্চে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা গুনে উপস্থিতি নির্ণয় করতে পারবে।

উচ্চ শ্রেণীর ভূত
উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে আতঙ্ক আরো গভীর পর্যায়ে পৌঁছায়। এক্ষেত্রে অংকের ভূতেরা সদলবলে শিশুমনে আক্রমণ করে।
এ'সময় সরল পাটিগণিতের সঙ্গে নতুন আতঙ্ক হিসেবে বীজগণিত, জ্যামিতি ও পরিমিতির আবির্ভাব ঘটে। বীজগণিতের অজানা রাশি 'X' এক মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত হয়। গণিতের বিমূর্ত এই রূপের সাক্ষাতে ভীত সন্ত্রস্ত পড়ুয়া মন্ত্রশুদ্ধির মত বীজগাণিতিক সূত্রাবলী মুখস্ত করে যুদ্ধে নেমে পড়ে।
কিন্তু বীজগণিতের মতো কঠিন ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ যে ভীষণ মায়াজাল বিস্তার করে তা সহজ সূত্রের মতো অস্ত্রের দ্বারা সব সময় ভেদ করা সম্ভব হয় না। এই যুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের হার এক রকম অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ফলে এই সময় যুদ্ধে ক্রমাগত পরাজিত হতে হতে ছাত্রছাত্রীরা ক্রমেই মানসিক দিক থেকে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। যার প্রভাব তার ব্যক্তিগত জীবনেও লক্ষ্য করা যায়।
উচ্চ শ্রেণীর ভূত তাড়ানোর উপায়
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিশুর গণিত ভীতি দূর করার জন্য প্রধান দায়িত্ব বর্তায় তার পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের উপর। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য বাজারের হিসাব তাকে স্বাধীনভাবে করতে আমরা ভরসা পাই না; ভাবি, হিসাবে ভুল করবে এবং ঠকে যাবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, অভিভাবকের উপযুক্ত তত্ত্বাবধানে 'ঠকে যাওয়া'র অর্থ অনুধাবন করার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা লাভ-ক্ষতি সংক্রান্ত সহজ উপায় গ্রহণ করতে পারবে। পারিবারিক ব্যাংকের কাজকর্মে তাকে সঙ্গে রাখলে সুদকষা সম্পর্কে তার ধারণা স্বচ্ছ হবে। এভাবেই শিশুর বাস্তব জ্ঞানের পাল্লা ভারী হওয়ার সাথে সাথে বইয়ের পাতার "কালো" বর্ণগুলো তার কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে ধরা দিবে।
বীজগণিত শেখার আগে শিশুদের জ্যামিতির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করা তার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবশ্য কর্তব্য। গণিত কে মূর্ত-করনের অন্যতম হাতিয়ার হলো জ্যামিতি। শিশু তার মনের ভাব লেখ্য রূপে প্রকাশ করার প্রথম পন্থা হিসেবে লেখার চেয়ে ছবি আঁকা কে বেছে নেয়।
শিশুর অপটু হাতে আঁকা ছবি যে প্রকৃতপক্ষে বিন্দু, সরলরেখা ও বক্ররেখার সমাহার তা হৃদয়ঙ্গম করাতে পারলেই তার আঁকাবাঁকা রেখা ধীরে ধীরে সোজা হবে, বক্ররেখা নিয়ন্ত্রিত হবে এবং এর মধ্যে দিয়ে তার মনে জ্যামিতির ধারণা দৃঢ় হবে। ধীরে ধীরে 'প্রতিফলন', 'ঘূর্ণন' ইত্যাদি ধারণা লাভের মধ্যে দিয়ে জ্যামিতির প্রতি তার আগ্রহ বাড়বে।
বীজগণিতের বিমূর্ত রূপকে মূর্ত করার উপায় হল জ্যামিতি।
বীজগণিতের নিয়মগুলি জ্যামিতিক চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করলে "X" নামের বিভীষিকা আর ভয় দেখাতে পারবে না বলে মনে হয়। গণিতের অন্য বিষয়গুলির চাইতে বীজগণিতের রাশিমালা গুলি ছোট ছোট মাপের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা যায়।
বীজগণিত শেখানোর সময় তাই নির্দিষ্ট কোনো বীজগাণিতিক সমস্যা একাধিক উপায়ে সমাধান করে দেখালে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীরা অংকে ভুল করলে তাকে বকাঝকা না করে ভুলের কারণগুলি সহজভাবে বিশ্লেষণ করে দেখানোটা বিশেষভাবে দরকার। তাদের বোঝানো প্রয়োজন- 'ভুল করা' হলো সঠিক উপায় খুঁজে বের করার প্রথম ধাপ।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের সামান্য উৎসাহসুচক বাক্য শিক্ষার্থীর মনোবল বাড়িয়ে তোলে। যার প্রভাবে বাস্তব জীবনেও সে ভুল করলেও বিচলিত না হয়ে লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলার সহজ অর্জন করে। শৃংখলাবদ্ধ অনুশীলনের মাধ্যমে শুধুমাত্র গণিতই নয়, জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই জয় লাভ সম্ভব।
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে গণিতের ভিত্তি মজবুত হলে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। যার মাধ্যমে সে বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়েও পারদর্শিতা প্রদর্শনে সক্ষম হয়। ফলে শিক্ষার্থী শিক্ষাকে বহন করার পরিবর্তে বাহন করে জীবনপথে অগ্রবর্তী হতে পারে।
ভোঁতা ছুরি দিয়ে যেমন সবকিছু ভেদ করা যায় না, প্রয়োজন হয় ধারালো অস্ত্রের; তেমনই বাস্তব জীবনের সমস্যা দূর করার জন্য প্রয়োজন ক্ষুরধার মস্তিষ্কের। আর মস্তিষ্ক ক্ষুরধার করতে গেলে শান দিতে হয় গণিতের অনুশীলনে, সমস্ত 'অদ-ভূত'কে তাড়িয়ে।