সমাজ

ব্রাহ্মণ্যবাদ, কুসংস্কার ও অপবিজ্ঞানের আগ্রাসন

অঞ্জন প্রামাণিক
অঞ্জন প্রামাণিক 07 Mar, 2026
২৯
হরমপুর শহরতলির কৃষ্ণমাটি, হরিদাসমাটি, অযোধ্যানগর, ভাকুড়ি, চুনাখালি, নিমতলা ও গঙ্গার ওপারে উত্তরপাড়া সংলগ্ন অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে নিম্নবিত্ত ও তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষের বসবাসস্থল। এদের অধিকাংশই শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিশ্রমিক বা দিনমজুর।
 
     ব্রিটিশ আমল থেকে এই অঞ্চলে জাতপাতের শৃঙ্খল খানিকটা হলেও শিথিল ছিল, কারণ এখানকার মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের (আর এস এস -এর মদতপুষ্ট বি.জে.পি.) প্রত্যক্ষ মদতে এই এলাকায় কুসংস্কার, অপবিজ্ঞান ও ব্রাহ্মণ্যবাদী শিকড় নতুন করে বিস্তার লাভ করছে।
 
ব্রাহ্মণ্যবাদের নতুন চক্রান্ত:
     ব্রাহ্মণ্যবাদ কেবল ধর্মীয় নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যম। ইতিহাস সাক্ষী যে, যখনই কোনো অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, তখনই ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলে। বহরমপুর শহরতলিতেও সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
 
সাম্প্রতিক কার্যকলাপ:
     • গ্রামে গ্রামে তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ যজ্ঞ’ (গোটা মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে) যা মূলত নিম্নবর্গের সংস্কৃতি ধ্বংসের হাতিয়ার।
 
     • দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে কুসংস্কার প্রচার করে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানচেতনার বিরুদ্ধে বিষ ছড়ানো।
 
     • দেবদেবীর ‘পুনরুত্থান’( ব্রহ্মা পুজো, রাম পুজো, গণেশ পুজো ইত্যাদি ) ঘটিয়ে লোকায়ত বিশ্বাসকে ব্রাহ্মণ্যিক কাঠামোয় ঢোকানোর চেষ্টা। 
 
     • বৌদ্ধ ও চার্বাক দর্শনকে ‘অহিন্দু’ বলে চিহ্নিত করে মানুষের চিন্তাকে সংকীর্ণ করে তোলা।
 
     • মেয়েদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার বিরুদ্ধে প্রচার, যাতে সমাজের একটা বড় অংশ দুর্বল ও নির্ভরশীল হয়ে থাকে।
 
    • নিম্নবর্গের দেবতাদের নতুন করে দখলদারি আগেও দেখা গেছে ,এখনও দেখা যাচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ লোকায়ত দেবতাদের আত্মসাৎ করছে । এবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
 
     • গ্রামীণ সমাজে যে মনসা ও শীতলা ছিলেন স্বাস্থ্যের দেবী, এখন তাঁদেরই পুজো করা হচ্ছে সম্পূর্ণ ব্রাহ্মণ্যিক পদ্ধতিতে, যেখানে পুরোহিত শ্রেণি নিয়ন্ত্রক।
 
     • শিবের নাম করে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পশুপতি, লিঙ্গপূজা ও দরিদ্র শ্রেণির শিব-উপাসনার জায়গায় এখন ‘উচ্চবর্ণীয়’ শৈবধর্মের সুপরিকল্পিত প্রচার।
 
     • পরম্পরাগত লোকচিকিৎসার বিকৃত ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস কাজে লাগিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিতদের ‘তন্ত্রসাধনা’র নামে ভণ্ডামি।
 
     • মেয়েদের রজঃস্বলা অবস্থায় ‘অশুচি’ বলে অপমান, যা আসলে নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র ।
 
     নয়া প্রজন্মের মধ্যে অপবিজ্ঞান ও কুসংস্কারের বিস্তার হচ্ছে হোলি ও শিব চতুর্দশীর ভয়ংকর প্রসারের মাধ্যমে। পুরো জেলা জুড়ে টাকা উড়েছে এই কয়দিন। এসব করার জন্য বি.জে.পি. দেদার টাকা খরচ করে চলেছে।
 
     এই ব্রাহ্মণ্যবাদ শুধু ধর্মীয় বিভাজনই তৈরি করে না, এটি সমাজের সবচেয়ে শোষিত শ্রেণিকে আরও দুর্বল করার হাতিয়ার। বহরমপুরের শহরতলির বর্তমান পরিস্থিতি তার প্রমাণ। কুসংস্কার, অপবিজ্ঞান, দেবতাদের বিকৃতি এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত—এই সব মিলিয়ে সমাজকে পিছিয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
 
     একদিকে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা চলছে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। গোমূত্র ও গঙ্গাজল নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। ক্যানসার, ডায়াবেটিস থেকে শুরু করে যে কোনো রোগ নিরাময়ের জন্য এসব প্রচার করা হচ্ছে।   
 
 এই ধরনের প্রচারের পেছনে একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হল-
     • নিম্নবর্গের মানুষের আত্মপরিচয় মুছে ফেলা: যাতে তারা নিজেদের আলাদা সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে না পারে।
     • একক ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা: যাতে বৌদ্ধ, লোকায়ত, আদিবাসী বা অন্যান্য স্বতন্ত্র বিশ্বাস হারিয়ে যায়।
     • শ্রমজীবী শ্রেণিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রাখা: যাতে তারা কখনোই বিদ্রোহ করতে না পারে।
     • বিজ্ঞানচেতনার অবক্ষয় ঘটানো: কারণ যুক্তিবাদী মানুষ কখনোই শোষণের শিকার হতে চায় না।
thescroll.in
ব্রাহ্মণ্যবাদী গ্রাসে নিম্নবর্গের দেবতা ও বুদ্ধদেব- ইতিহাসের এক নিঃশব্দ রূপান্তর:
     ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, সমাজের প্রান্তিক ও নিম্নবর্ণের মানুষের উপাস্য দেবতাদের ব্রাহ্মণ্যবাদ কৌশলে আত্মসাৎ করেছে। যেসব দেব-দেবী একসময় তথাকথিত উচ্চবর্ণের মূলধারার বাইরে ছিলেন, ধীরে ধীরে সেগুলিকে ব্রাহ্মণ্যিক ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন, শিব, মনসা, ধূমাবতী, শীতলা, কালী বা এমনকি লোকায়ত পরম্পরার বহু দেবতাকে পরে 'বেদীয়' পরিচিতি দিয়ে ব্রাহ্মণ্যিক ধর্মগ্রন্থে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এই একই প্রবণতা বুদ্ধদেবকেও স্পর্শ করেছে, যিনি একসময় ব্রাহ্মণ্যবাদের শোষণ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।
 
নিম্নবর্ণের দেবতাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী দখলদার:
     অতি প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামীণ ভারতীয় সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষ শিব, মনসা, কালী, অজগর পূজা, পিশাচ-দেবতা এবং অন্যান্য অগ্রাহ্য দেবতাদের উপাসনা করত। এই দেবতারা ছিল লোকায়ত বিশ্বাসের অংশ, যেগুলি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার প্রতিচ্ছবি বহন করত। কিন্তু যখন এই দেবতাগুলির জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল, ব্রাহ্মণ্যবাদ কৌশলে এগুলিকে নিজেদের ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে শামিল করে নিল।
 
শিবের রূপান্তর:
     প্রাচীন দ্রাবিড় ও আদিবাসী সমাজে শিব ছিলেন পশুপতি—এক আদিম দেবতা, যিনি প্রকৃতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁকে বৈদিক সংস্কৃতির মধ্যে এনে 'মহাদেব' করে তোলা হয় এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোয় স্থাপন করা হয়।
 
মনসা ও শীতলা:
     এই দুই দেবী বিশেষত নিম্নবর্গের ও গ্রামীণ জনগণের মধ্যে পূজিত হতেন, বিষধর সাপ ও মহামারির প্রতিরোধক হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে ব্রাহ্মণ্যবাদ মনসাকে শিবের কন্যা এবং শীতলাকে দেবী পার্বতীর এক রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
 
বুদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যিক চক্রান্ত:
     গৌতম বুদ্ধ ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের রীতি, বর্ণভেদ প্রথা এবং পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। তিনি যজ্ঞ, দেবতারূপী প্রতিমা-পূজা এবং ব্রাহ্মণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের আত্মনির্ভরতার উপর জোর দিয়েছিলেন। ফলে, তাঁর শিক্ষা ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোর পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
 
বুদ্ধের হিন্দুকরণ ও শিবের সঙ্গে সংযুক্তি:
     যখন বৌদ্ধ ধর্ম উপমহাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, ব্রাহ্মণ্যবাদ ধীরে ধীরে বুদ্ধকে 'দশাবতার'-এর নবম অবতার হিসেবে ঘোষণা করে। এটি ছিল একটি কৌশল, যাতে বুদ্ধকে স্বাধীন চিন্তাবিদ বা ধর্মগুরু হিসেবে না দেখে, বরং হিন্দু ধর্মের অংশ হিসেবে দেখানো যায়।
 
বৌদ্ধ বিহার থেকে শিব মন্দির:
     বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বহু প্রাচীন বৌদ্ধবিহারকেই পরবর্তীকালে শিব মন্দিরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ-
১. বুদ্ধগয়া ও মহাবোধি মন্দির: এখানে একসময় শুধুমাত্র বৌদ্ধ ভিক্ষুরা উপাসনা করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এটি হিন্দুদের কাছে ‘বোধিবৃক্ষতলে শিবের ধ্যান’ হিসেবে প্রচারিত হয়।
২. কাশী বিশ্বনাথ মন্দির: ঐতিহাসিকভাবে এখানে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ছিল, কিন্তু পরে এটি একান্তভাবে শৈব তীর্থ হয়ে ওঠে।
৩. অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ভারতের বহু স্থানে বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষের উপর শৈব মন্দির গড়ে তোলা হয়েছে।
 
প্রভাব ও সামাজিক পরিণতি:
     ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্তৃত্ব কৌশলে বহু ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে—
নিম্নবর্গের মানুষদের নিজস্ব ধর্মীয় চেতনা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেছে। বুদ্ধের প্রকৃত শিক্ষা ও সাম্যবাদী দর্শন ব্রাহ্মণ্যবাদী রূপান্তরের ফলে বিকৃত হয়েছে। নিম্নবর্গের মানুষের পূজিত দেবতারা উচ্চবর্ণীয় ধর্মীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে, ফলে তাদের মূল পরিচয় বিলুপ্ত হয়েছে।
 
     এটি শুধু ধর্মীয় ইস্যু নয়, এটি সামাজিক অস্তিত্বের লড়াই। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে সামনে ভয়ংকর সময় অপেক্ষা করে আছে।
 
     গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন— "তোমার মুক্তির পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। অন্যের উপর নির্ভর করে কখনো মুক্তি আসবে না ” ।
 
এর বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ও যুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। কুসংস্কার দূর করার জন্য কর্মশালা ও শিক্ষা-আন্দোলন গড়ে ওঠা দরকার। প্রয়োজন-
     • নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ: লোকদেবতা, বৌদ্ধ দর্শন ও লোকায়ত বিশ্বাসের প্রকৃত রূপ মানুষের সামনে তুলে ধরা।
     • রাজনৈতিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি: যাতে মানুষ বুঝতে পারে, এই কৌশল শুধুমাত্র বিভক্ত করার জন্য।
     • নারীদের অগ্রাধিকারের লড়াই: কারণ সমাজে কুসংস্কার ও ব্রাহ্মণ্যিক শাসনের প্রথম শিকার হয় নারীরা।
 
     ব্রাহ্মণ্যবাদ কেবল একটি ধর্মীয় কাঠামো নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যম। ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই, ব্রাহ্মণ্যবাদ বহুবার তার প্রতিপক্ষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার উপর দখল বসিয়েছে, এবং এটি আজও অব্যাহত রয়েছে। গৌতম বুদ্ধ, যিনি মানুষের আত্মনির্ভরতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিও এই প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। তাঁর শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত শোষিত-বঞ্চিত শ্রেণির জন্য, যারা ব্রাহ্মণ্যবাদী দখলদারির কারণে তাদের নিজস্ব ইতিহাস হারিয়ে ফেলছে।
     
     একমাত্র সচেতনতা ও ইতিহাসের পুনঃপাঠই পারে এই ব্রাহ্মণ্য-আধিপত্যবাদী চক্রান্তের মুখোশ খুলে দিতে।
অঞ্জন প্রামাণিক

অঞ্জন প্রামাণিক

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।