আন্তর্জাতিক
সৎ মানুষদের দেশ
১.
সাহেল অঞ্চলের আকাশটা আজ সন্ধ্যায় অস্বাভাবিক রকমের চুপচাপ। যেন কিছু একটা ঘটার আগে পৃথিবী নিজের শ্বাস আটকে রেখেছে।
বুরকিনা ফাসোর এক প্রত্যন্ত গন্ডগ্রাম—বন্ডোকুই। লাল রাস্তার উপর থেকে দক্ষিণ দিকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার মতো পাতলা ধুলোর চাদর। এই নীরবতা চিরে একটু আগেই কর্কশ শব্দ তুলে ছুটে গেছে কয়েকটা জিপ।
রক্তের সম্পর্কের কাউকে যদি পাওয়া যায় -এইটুকুই ছিল ভরসা। উচ্চপদস্থ কাউকে ব্ল্যাকমেল করতে পরিবারের কাউকে তুলে নেওয়া, এটাই ওদের পুরনো কায়দা। কিন্তু আজ সেই কায়দা কাজে এল না। কাউকে পাওয়া গেল না গ্রামে ।
নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হল ‘আনসারুল ইসলাম’ নেতা জাফর ডিকোর এক বিশ্বস্ত কমান্ডারকে। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে তার। বুঝে গেছে, এবার আর সময় নেই। ওয়াগাদুগুর নতুন শাসকের হাত থেকে ভাড়াটেদের রেহাই নেই আর।
অনেকদিন ধরেই বুরকিনার মানুষ একটা কথা বলছিল। ফ্রান্স আর তথাকথিত ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত যোগসূত্র আছে। এই অভিযোগ নতুন ছিল না। কিন্তু এতদিন এটাকে বিরোধীদের অপপ্রচার বলেই চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আসলে, উপনিবেশ ছেড়ে যাওয়া শক্তিগুলো কখনোই সত্যিকারের বিদায় নেয় না। পুরনো কলোনিকে চাপে রাখতে ভাড়াটে শক্তি, ভাড়াটে মতাদর্শ আমদানিই তাদের পুরনো অস্ত্র।
একটা দেশকে যদি নিয়মিত অস্থির রাখা যায়, তাহলে তার সম্পদগুলি হাতানোটা বেশ সহজ হয়। আবার বিশ্বদরবারে দাঁড়িয়ে শান্তির গল্প শোনানোর একটা সুযোগও তৈরি হয়। বুরকিনা ফাসোও তার ব্যতিক্রম নয়।
২.
২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর।
কাকভোর। সামান্য ঠান্ডাতেই ওয়াগাদুগু শহর যেন জমে গেছে। রাস্তায় সাধারণ মানুষের কোনো চলাচল নেই। শুধু ঘনঘন ভারী সামরিক যানের শব্দ।
রাতভর সেনা ছাউনির আশপাশে গুলি আর গোলার আওয়াজ মানুষকে বিনিদ্র ও অস্থির করেছিল ঠিকই, কিন্তু ভোরে কেউ ঘর ছাড়েনি। সবাই বুঝছিল, বড় কিছু একটা আসছে।
বেলা একটু বাড়তেই মানুষ বাইরে বেরোতে শুরু করে। আর তখনই চোখে পড়ে যায় দৃশ্যটা। ‘প্যলাসিয়া দ্য কোসিয়াম’ রাষ্ট্রপতি প্রাসাদের সামনে সারি সারি ট্যাঙ্ক। সাঁজোয়া গাড়ি। রাস্তাগুলো থেকে টেনে নামানো হচ্ছে আগের জান্তা সরকারের প্রেসিডেন্ট পল হেনরি সানদিয়েগো দামিবার ব্যানার।
এক মুহূর্তেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। ফ্রান্সের নয়নের মণি, পল হেনরি সানদিয়েগো দামিবার পতন হয়েছে।
বেলা এগারোটার দিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিবি-তে এক সেনা কর্তার মুখ ভেসে ওঠে। ক্যাপ্টেন কিসওয়েন্ডসিদা ফারুক আজারিয়া সোরঘো'র ঘোষণা- “ উই উইশ টু ইনফর্ম দ্য পপুলেশন দ্যাট দ্য সিচুয়েশন ইস আন্ডার কন্ট্রোল…”
কিন্তু তিনি কোন নাম বলেন না। কারণ নামটা জানতে তখন আর টেলিভিশনের প্রয়োজন ছিল না। এরপর ওয়াগাদুগুর রাজপথ ফেটে বেরিয়ে আসে সেই নাম- “Vive Ibrahim Traoré!” (ইব্রাহিম ত্রাওরে রে দীর্ঘজীবী হোক!)
ওয়াগাদুগুর রাস্তায় তখন উল্লসিত মানুষের ঢেউ। কিন্তু এই উল্লাসের শেকড় অনেক গভীরে।

৩.
ফিরে যেতে হয় অনেক পেছনে, ১৯৬০ সালে।
ফরাসি শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে 'আপার ভোলটা' নিজেকে প্রকাশ করেছিল এক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে। কাগজে-কলমে স্বাধীনতা এসেছিল। কিন্তু বাস্তবে শেকল বদলেছিল শুধু। ফ্রান্স দেশ ছাড়লেও রেখে গিয়েছিল নিজের ছায়া। রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সবখানেই।
গোটা বিশ্বের মোট সোনা উৎপাদনের প্রায় দুই শতাংশ কন্ট্রিবিউট করা একটি দেশের মাটির নিচে সোনা, লোহা, ইউরেনিয়ামের অপার সম্পদ। আর মাটির ওপরে ক্ষুধা। বিদেশি কোম্পানি, মূলত ফরাসি ও পশ্চিমা কর্পোরেট গোষ্ঠী, আর দেশের শাসক এলিটদের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত সে সম্পদ।
সাধারণ মানুষ? তারা নিতান্তই দর্শক। নিজের দেশের সম্পদ দেখত, কিন্তু ছুঁতে পারত না।
ভোটাধিকার না থাকলেও বিদেশি কোম্পানির ছিল পূর্ণ অধিকার। ফরাসি ব্যাংকিং ব্যবস্থা বছরের পর বছর বুরকিনার অর্থনীতির শিরদাঁড়া চেপে ধরে রেখেছিল। দেশের মানুষ যেন হয়ে উঠেছিল উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মজুর, তার নিজের দেশেই।
পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা কাজ করছিল নিখুঁতভাবে। আফ্রিকা মানেই গরীব, অশিক্ষিত, হাভাতে। এই গল্পটাই বিক্রি করা হতো বিশ্ববাজারে। আর সেই গল্পের আড়ালেই পাচার হয়ে যেত সোনা, খনিজ, কৃষিপণ্য, আর মানুষের অধিকার।
১৯৬০ থেকে ২০২৩। এই দীর্ঘ সময়ে বুরকিনা ফাসো পেয়েছে অনেক রাষ্ট্রপতি, মরিস ইয়ামেওগো থেকে হেনরি দামিবা। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত একজনকেই আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
৪.
১৯৮৩ তে সেনা বিপ্লবের ভেতর দিয়ে উঠে আসেন এক সেনা অফিসার, থমাস সাঙ্কারা।
তিনি ক্ষমতায় এসেই প্রথম জাতীয় সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেন। তিনি খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে বিলাসিতা নয়, অধিকার হিসেবে ভাবতে শেখান। ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য ভেঙে দেশকে ফরাসি তথা পশ্চিমা প্রভাব বলয়ের বাইরে বের করে আনতে সচেষ্ট হন।
IMF ও World Bank -এর ঋণব্যবস্থাকে সরাসরি নব্য ঔপন্যিবেশিকতাবাদের 'মেকানিজম' বলে চিহ্নিত করেন এবং গোটা আফ্রিকাকে ঋণ শোধ না করার ডাক দেন।
হয়তো এটিই ছিল তার অপরাধ। ১৯৮৭, অদ্ভুতভাবে নিহত হতে হয় তাকে। আফ্রিকান ওয়াচ ডগ গবেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে এটি ছিল পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের আরেকটি বাস্তবায়ন।
সাঙ্কারা ছিলেন স্পষ্টভাবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্যবাদ-বিরোধী বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তার অবস্থানগুলো সরাসরি ফ্রান্স ও পশ্চিমা শক্তির অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিরোধী ছিল। হয়ত পশ্চিমা বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল এই লোকটা বাঁচলে অন্যরাও সাহস পেয়ে যাবে।
থমাস সাঙ্কারাই দেশের নাম 'আপার ভোলটা' (উচ্চভূমি) বদলে রাখেন 'বুরকিনা ফাসো' বা 'সৎ মানুষদের দেশ'। সাঙ্কারা শুধু নাম বদলাননি, তিনি বদলাতে চেয়েছিলেন আফ্রিকার ভবিষ্যৎকেও।

৫.
সাহেলের লাল মাটির প্রান্তরে, এক অনামী গ্রামে, কেরোসিন বাতির আলোয় এই গল্পগুলো শুনে শুনে বড় হচ্ছিল এক শৈশব। এইসব গল্প শুনতে শুনতে, শহর থেকে গ্রামে পৌঁছানোর ধকল সহ্য করতে না পারা জীর্ণ বইগুলো বুকে চেপে ধরেই ঘুমিয়ে পড়ত সে। তার মাথায় তখন প্রশ্ন- একটা দেশ কি সত্যিই নিজের দেশ হতে পারে না?
জুন মাস। সাভানার দোরি-আরবিন্দা অঞ্চলে বর্ষা শুরু হয়েছে। মাটি ভিজছে। ঝুপড়িগুলোর পাশে ডাঁই করে রাখা সিকুই, গউলুই, ইয়েরে, ফান্দো। কৃষকের দিনের শুরু হয় কাঙ আর সিকুই দিয়ে। লাঙ্গলের নিঃশব্দ আঘাতেই সেখানে লেখা হয় ফসলের ভবিষ্যৎ। কয়েক মাস পর এই মাটিই দেবে স্বর্ণালী ফসল। গ্রামগুলি ঘুমোচ্ছিল স্বপ্নে বিভোর হয়ে।
কিন্তু ২০২২ -এর এক ভোররাতে ঘুম ভাঙে গুলির শব্দে আর আর্তনাদে। অটোমেটিক রাইফেলের গুলি আর সেমবুর আঘাতে লুটিয়ে পড়ে শত শত নারী, পুরুষ, শিশু। একটার পর একটাঝুপড়ি জ্বলে ওঠে। চারিদিকে শুধু আগুন আর হাহাকার। প্রাণভয়ে মানুষ ছুটে পালায় সন্তান, ঘর, স্মৃতি সব ফেলে রেখে।
এইটাই ছিল সেই নিরাপত্তা, যার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২১ এ ক্ষমতায় বসেছিলেন পল হেনরি সানদিয়েগো দামিবা।
৬.
দেশ তখন জঙ্গি সন্ত্রাসে জর্জরিত।
সাহেল অঞ্চলের একের পর এক প্রদেশ—সৌম, সিনো, লোরুম, ইয়াতেঙ্গা, তাপাও, কমনজারি ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল রাষ্ট্রের হাত থেকে।JNIM, ISIS-Sahel-এর মতো গোষ্ঠীগুলো সেখানে কায়েম করছিল নিজেদের সমান্তরাল শাসন।
দামিবা নামের যে সেনা অফিসার 'যুদ্ধে জিততে' এসেছিলেন, তার আমলেই রাষ্ট্র হারাতে থাকে নিজস্ব ভূখণ্ড, নিয়ন্ত্রণ আর সার্বভৌমত্ব।
ক্ষমতায় বসেই তিনি যা শুরু করলেন, সেটি স্পষ্টতই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। সামরিক বাজেট অস্বচ্ছ হয়ে উঠল। দেশ রক্ষার নামে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সামরিক চুক্তি, ফরাসি সামরিক উপস্থিতি আরও পাকাপোক্ত করা, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো যেন আর ওয়াগাদুগুতে নেওয়া হচ্ছিল না।
জঙ্গিরা শক্তিশালী হচ্ছিল, রাষ্ট্র দুর্বল। আর সাধারণ মানুষ? তারা আরও একবার বুঝেছিল- শাসন বদলালেও শাসকের চরিত্র বদলায়নি।
৭.
২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। মাঝ রাত।
N22 জাতীয় সড়ক ধরে ওয়াগাদুগু থেকে ডিজিবোর দিকে খাবার ও ওষুধ নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল একটি কনভয়। অবরুদ্ধ গ্রামগুলোর জন্য শেষ ভরসা।
হঠাৎ অন্ধকার থেকে ছুটে আসে রকেট আর বুলেট। মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পঞ্চাশের বেশি সেনা ও বেসামরিক মানুষ। রাস্তা জুড়ে ছিন্ন ভিন্ন দেহ।
তিন দিন কেটে যায়। সরকার চুপ।নিহতদের নাম নেই। সংখ্যা নেই। পরিবারগুলোর কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই নীরবতাই ছিল শেষ সংকেত।
ওয়াগাদুগু জ্বলে ওঠে। মানুষ রাস্তায় নামে। ফরাসি দূতাবাসের সামনে আগুন জ্বলে। স্লোগান ওঠে- “À bas la France!” (ফ্রান্স নিপাত যাক) ।
সেনা ছাউনির ভেতরেও কিছু একটা বদলাচ্ছিল। যারা ফ্রন্টলাইনে লড়ছিল, তারা জানত, এই যুদ্ধটা ঠিকভাবে লড়া হচ্ছে না।
সেই সময়, ওয়াগাদুগুর এক কোণে বসে সবকিছু নতুন করে ভাবছিল এক তরুণ অফিসার। ২০১০ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে সে। এরপর থেকে দেখেছে শুধু মৃত্যু, ভূখণ্ড হারানো, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। তার চোখে অন্ধকারে জ্বলছিল সাহেলের লাল মাটির রঙ।
৮.
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াগাদুগুতে ভূতত্ত্ব পড়ার সময়েই তার চোখ খুলে যায়। মাটির স্তর পড়তে পড়তেই সে পড়ে ফেলেছিল ইতিহাসের স্তরগুলো আর শাসন-শোষণের আন্তর্জাতিক রাজনীতি। তার বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে যায়, আফ্রিকা দরিদ্র নয়। কায়েমী স্বার্থে আফ্রিকাকে দরিদ্র করে রাখা হয়েছে।
ওদিকে দামিবা সরকার বাস্তবতা গুলিকে অস্বীকার করই যাচ্ছে। অবহেলা করছে মানুষের ক্ষোভকে। সেনাদের হতাশাকে শৃঙ্খলাভঙ্গ বলে দমিয়ে রাখছে।
কিন্তু হাওয়া বদলাতে শুরু করেছিল। ওয়াগাদুগুর রাস্তায় ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছিল - “সরকার বুরকিনার নয়।” এই ফিসফিসানি একদিন আর চাপা থাকেনি। মানুষের মনে প্রশ্নটা ওঠে, দেশটা আদৌ বাঁচবে কি না।
ওয়াগাদুগুর রাতটা সেদিন অস্বাভাবিক ঠান্ডা ছিল। আকাশে তারা ছিল, কিন্তু শহরের ভেতরে আলো কম। সেনা ছাউনিতে কেউ জোরে কথা বলছিল না। নির্দেশ আসেনি, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় নির্দেশ। যারা ওই রাতে জেগে ছিল, তারা জানত এটা আর কোনো রুটিন নাইট ডিউটি নয়। কিছু একটা ভেঙে পড়ছে। আর ভাঙার শব্দ সবসময় শোনা যায় না। রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে নীরবে।
দামিবার সরকার তখনও কাগজে ক্ষমতায়। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা তার হাত ফসকে গেছে। ফ্রান্সের ছত্রছায়ায় টিকে থাকা এই জান্তা সরকার জনগণ ও সেনা, দু’পক্ষেরই আস্থা হারিয়েছে। সেনারা জানত, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শত্রু শুধু জঙ্গি নয়। শত্রু হলো সেই কাঠামো, যেটা যুদ্ধের নামে দেশকে খালি করে দিচ্ছে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে একটা স্পষ্ট বার্তা ঘুরে বেড়াচ্ছিল- এইভাবে আর চলবে না।
৯.
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিক।
ওয়াগাদুগুর রাস্তায় মানুষের মুখে আর ফিসফিস নেই। স্লোগান এখন তীক্ষ্ণ - “À bas la France!”। এই স্লোগান ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ছিল ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল নিজেদের শাসকদের বিরুদ্ধে।
সেই রাতেই সেনা ছাউনির ভেতরে কিছু সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। কোনো নাটকীয় ঘোষণা নয়। কোনো বিপ্লবী ভাষণ নয়। শুধু একটাই প্রশ্ন- যদি এখন নয়, তাহলে কবে?
প্রেসিডেন্ট প্যালেসের দিকে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করে সামরিক যানের সরি। ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া গাড়ি। ঘুমন্ত শহরে এক ইতিহাস জেগে উঠেছিল।
ভোর। রাষ্ট্রপতি প্রাসাদের সামনে যখন সামরিক কনভার্টি দাঁড়ায়, তখন আর কাউকে বোঝাতে হয়নি,খেলা শেষ। পল হেনরি সানদিয়েগো দামিবা গদিচ্যুত হন কোন রক্তপাত ছাড়াই। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই। একটি শান্তিপূর্ণ বিস্ফোরণ।
বিটিবি-তে যখন সেনা মুখপাত্র কথা বলেন, তিনি শুধু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলেন। কোন নাম তিনি বলেন নি। না বলা নামটা নামটা তখন রাস্তায়- “Vive Ibrahim Traoré!” ।
এই নামটা হঠাৎ করে আসেনি। এটা অনেকদিন ধরে ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল।
১০.
ইব্রাহিম ত্রাওরে।
সাভানার এক প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলে। যে শৈশবে কেরোসিন বাতির আলোয় সাঙ্কারার গল্প শুনেছে। যে ভূতত্ত্ব পড়তে পড়তেই শিখেছে- মাটির নিচে কীভাবে সম্পদ লুকিয়ে থাকে, আর মাটির ওপরে কিভাবে লুকিয়ে রাখা হয় মানুষকে।
২০২২ সালের ২১ অক্টোবর। ৩৪ বছর বয়সে সে সময় বিশ্বের কনিষ্ঠতম রাষ্ট্রপ্রধান শপথ নেন সৎ মানুষদের দেশে। শপথ নেওয়ার দিন তার একটি বাক্য শুনে গোটা বিশ্ব সচকিত হয়ে ওঠে “আফ্রিকা কারো পরীক্ষাগার নয়।”
ওয়াগাদুগু তখনও উল্লাসে মাতোয়ারা। কিন্তু উল্লাস দ্রুতই প্রশ্নে বদলে যায়, এবার কি সত্যিই কিছু বদলাবে?
ইব্রাহিম আগেই শত্রু চিহ্নিত করেছিলেন। এই শত্রু শুধু জঙ্গি নয়। শত্রু সেই নেটওয়ার্ক, যেখানে অস্ত্র, অর্থ, রাজনীতি আর ভাড়াটে মতাদর্শ একে অপরের পৃষ্ঠপোষকতা করে। তিনি সরাসরি নির্দেশ দেন- সমূলে জঙ্গি দমন।
কোনো নির্বাচনী ক্যালকুলেশন নেই। কোনো আন্তর্জাতিক প্রশংসার আশাও নেই। সামনে শুধু একটি বাস্তবতা, খন্ড যদি বাঁচে তবে রাষ্ট্র বাঁচবে।
সেনাবাহিনীর ভেতরে শুরু হয় আমূল রদবদল। কাগজে নয়,কাজে।
প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত কমান্ড স্ট্রাকচার বদলানো হয়। ফ্রন্টলাইনের সৈন্যদের কথা শোনা হয়। কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে ইব্রাহিম নিজে উপস্থিত থাকেন অপারেশনাল স্তরে। এই উপস্থিতিই বদলে দেয় খেলার নিয়ম। একটার পর একটা জঙ্গি ঘাঁটি ভেঙে পড়ে। কিছু অপারেশনে নিহত হয়। কিছু পালিয়ে যায়।
‘আনসারুল ইসলাম’-এর সেই কমান্ডার, যে বন্ডোকুই থেকে খালি হাতে ফিরেছিল, সে ভয় যে তার অমূলক ছিল না সেটা প্রমাণিত হয়।
এরপর আসে সেই সিদ্ধান্ত, যেটা সবাই অপেক্ষা করছিল, আবার ভয়ও পাচ্ছিল। প্রাকৃতিক সম্পদ। ইব্রাহিম ঘোষণা করেন, এই সম্পদ আর কোনো বিদেশি স্বার্থের জামানত নয়। এগুলো জাতীয় সম্পত্তি। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক চাপ আসতে শুরু করে।হুমকি আসে। উপদেশ আসে। চিন্তিত বিবৃতি আসে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায় না।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। ফ্রান্স, দীর্ঘদিন ধরে যারা “সহযোগী” ছিল, যারা নিরাপত্তার নামে উপস্থিত ছিল,
এক কথায় তাদের বলে দেওয়া হয় 'চুক্তি শেষ'। ফরাসি সাবরে স্পেশাল ফোর্সকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয় দেশ ছাড়তে হবে। ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে ঘোষণা করা হয় 'persona non grata' ' অবাঞ্ছিত ব্যক্তি'।
এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় চারশো ফরাসি সেনা বুরকিনা ফাসো ছাড়তে বাধ্য হয়।
ওয়াগাদুগুর মাথার উপর সূর্যটা সেদিন একটু বেশিই লাল। রাজপথ সেদিন ভরে যায় জাতীয় পতাকা হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষে। কোনো স্পন্সর করা উল্লাস নয়। কোনো সাজানো দৃশ্য নয়। মানুষ নিজেরাই বেরিয়ে আসে। তারা বুঝে গিয়েছিল, এটা শুধু ফ্রান্স চলে যাওয়ার দিন নয়। বুরকিনা ফাসোর বুকে এটি ঔপনিবেশিকতার শেষ দিন।
সাভানার এক প্রান্তিক গ্রামের তরুণ, ইব্রাহিম ত্রাওরের হাত ধরে এভাবেই পুঁজিতান্ত্রিক-ঔপনিবেশিকতাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সমূলে উৎখাত করে মুক্তির দিকে পা বাড়ায় একটি সমগ্র 'সৎ মানুষদের দেশ' ।