ফিচার
এম.বি.বি.এস.
জানুয়ারির কনকনে শীতে শহরের কুয়াশাটা যেন হাসপাতালের গন্ধের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত নেশা তৈরি করেছে। অর্থোপেডিক্সে আজ আমার শেষ ডিউটি। ইন্টার্নশিপের সেই “ডাম ডাম, দম ফুরানো” বিভাগ, যেখানে টানা ১৪ দিন ২৪ ঘণ্টা মানুষদেখা, হাড়জোড়া, ব্যথার চিৎকার আর ঘুমের একযুগ ক্লান্তি নিয়ে এতদিন বেঁচে ছিলাম।
কিন্তু আজ ক্লান্তির ভেতরেও এক অদ্ভুত আলো; আর দু’মাস পরেই হাতে আসবে MBBS রেজিস্ট্রেশন।
হাহ্! ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। স্টেথোস্কোপ দেখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা মফস্বলের সেই ছেলেটা আজ সত্যিকারের ডাক্তার হয়ে উঠছে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হল, যত বাড়ছি তত বুঝছি ডাক্তার হওয়া কোনো ফিনিশ লাইন নয়।
এই জটিল অন্ধকার কঙ্কালসার স্বাস্থ্যজগৎকে কতটা বদলাতে পারলাম এটাই আসল চ্যালেঞ্জ। এক অবিরাম যুদ্ধের শুরু।
পড়ুয়া হিসেবে জীবনের এই ছয়টি বছর ছিল এমন একটা বিদ্যালয় যেখানে প্রকৃত শিক্ষক ছিল ভয়, দায়িত্ব, মৃত্যু, রাতজাগা, আর হাজারো মানুষের ব্যথা।
স্বপ্নভঙ্গের প্রথম ধাক্কাটা আসল কলেজের প্রথম বর্ষেই।
কলেজে ঢুকে বুঝলাম NEET পাস করা ছিল গেমের টিউটোরিয়াল লেভেল; আসল বস ফাইট শুরু হলো এখন।
ক্যাডেভার ডিসেকশনের প্রথম দিন মাথা ঘুরছিল, কিন্তু রাতেই বই খুলে বসা, কারণ এখানে পড়ার দাবী এমন যে ছাপাখানাকেও লজ্জা দিতে পারে। একটুখানি গাফিলতি মনে অবশ্যম্ভবী সাপ্লি।
সাপ্লি হল গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মত ব্যাপার। মানে একইসঙ্গে মুল পড়াশোনাটাও চালিয়ে যেতে হবে আবার সাপ্লি পাওয়া বিষয়টিতেও তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে আবার ক্লিয়ারেন্স পেতে হবে। না হলে টোটাল ফেল। সাপ্লি পাওয়াটা সাধারণ ব্যাপার, পরে ক্লিয়ার করতে পারলেই ঝামেলা চুকে যায়। অথচ সমাজের চোখে এটি ভীষণ রকম 'ফেল'।
একবার চার নম্বরের জন্য সাপ্লি পাওয়া এক দাদাকে বহুতল হোস্টেলের ছাদের কিনারায় অসংলগ্ন পায়চারি করতে দেখে কাঁধ ধরে টেনে নামিয়েছিলাম, মুখ কালো, চোখ কালি-মাখা। আর কয়েক বছর পরে সেই সিনিয়র দাদাটিরই AIIMS এ চমৎকার র্যাঙ্ক!
তখন বুঝলাম মেডিক্যালে একবার খারাপ রেজাল্ট মানে জীবনের ইতি নয়, পুরো গল্পের একটা পাত্তা না দেওয়ার মতো দৃশ্য।
২০২১-২০২৪ এই কয়েক বছরে সাপ্লি পেয়ে ২০০ 'র মতো মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন (NCRB) শুধুমাত্র পরিবারের চাপ, সমাজের ব্যঙ্গাত্মক ভ্রুকুটি আর ডিপ্রেশনের কারণে। এই সংখ্যাগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয়, আসলে আমাদের বুকের ভিতর রক্তচাপ বাড়ানো র্যাট-রেস ট্র্যাজেডি।
দ্বিতীয় বর্ষে বুকে ভয় ধরানো বইয়ের পাহাড়ের পাশাপাশি হাসপাতালের নগ্ন বাস্তব ভীষণ আঘাত করত।
হোস্টেলে ও হাসপাতালের আশে পাশে আবর্জনার স্তূপ, একটু চুপিসাড়ে চাপা পড়ে থাকা মেডিক্যাল ওয়েস্টেজ (এটি একটি মারাত্মক বস্তু) দেয়ালে পানের পিক, এক দমবন্ধ অস্বাস্থ্যকর নরক। হাস্যকর ভাবে কোথাও আবার দেবদেবীর পোস্টার লাগানো হয়েছে শুধুমাত্র লোকজন যাতে লোকজন থুথু না ফেলে বা প্যান্টের চেইন খুলে দাঁড়িয়ে না যায় এই কারণে।
হাসপাতাল ও হাসপাতাল সংলগ্ন অঞ্চলে অপরাধপ্রবণ মানুষদের একটা nexus যে সক্রিয় এটা ওই সময় আবিষ্কার করি। হাসপাতালে হালকা-পাতলা চুরি কেপ মারির ঘটনা প্রায় নিয়মিত। হোস্টেলে অপরিচিত মুখেদের যাতায়াত। অনেক সময় উধাও হয়ে গেছে ট্যাব, ফোন বা ল্যাপটপ।
হাজার কোটি বাজেটের দেশেও ডাক্তারদের জন্য নিরাপদ হোস্টেল এখনও অলীক কল্পনা। সাধারণ মানুষের কথা ছেড়েই দিলাম।
তৃতীয় বর্ষ আক্ষরিক অর্থেই হাসপাতালের গন্ধে মানুষ হয়ে ওঠার সময়। এখন মিলল সত্যিকারের রোগী হাতে-কলমে দেখার সুযোগ। রোগীর কেস হিস্ট্রি নিতে গিয়ে বুঝলাম বইয়ের ভাষা আর রোগীর ভাষায় আসমান জমিন তফাৎ।

অ্যাসিড খেয়ে ফেলা এক রোগীর চিল-চিৎকারে তার উত্তেজিত পরিবার স্টমাক ওয়াশ করাতে প্রায় কলার ধরেছিল আমার। ডাক্তারি গাইডলাইন অনুযায়ী সাধারনত বিষ খেলে পেট ওয়াশ করাতে হয় কিন্তু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টে অ্যাসিড খাওয়া পেশেন্টদের রাইলস টিউব দিয়ে পেট ওয়াশের নিয়ম নেই,সেটা করলে পেটে ফুটো হয়ে যাবার সম্ভবনা থাকে।
ওদিকে পেশেন্ট চিৎকার করছে ডাক্তারবাবু আপনি আমার পেট ওয়াশ করুন । আমি তার কথা নাকচ করাতে, ক্ষুব্ধ হয়ে আমায় বিভিন্ন ভাষায় গালিগালাজ দিতে থাকে চিৎকার করতে থাকে 'এ তো ফালতু ডাক্তার, বালের ডাক্তার, নতুন এসেছে কিছুই জানে না। আমায় নার্সিং হোম এ নিয়ে চল।'
বুঝলাম শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, আমাদের কাজ হলো মানুষের ভুল ধারণার সঙ্গেও লড়াই করা। রোগীর এই ভুল ধারণা কে ক্যাশ করি আজ রমরমিয়ে চলছে নার্সিংহোমেগুলোর ব্যবসা।
এসব অপমানের সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেলের অতি নিম্নমানের খাবার, দুই তিন দিন স্নান নাওয়া খাওয়া ভুলে ডিউটি, একাডেমিকের পর্বত প্রমাণ চাপ ধীরে ধীরে ক্রমশ মেনে নিতে শিখছিলাম।
ওদিকে মেডিক্যালে আরেক সমস্যা হলো বই। লাইব্রেরির বই চাইলেই ব্যবহার করা যায় না, মার্ক করা যায় না, নিজের বই লাগবেই। বইয়ের দাম দেখে হৃদয় ফেটে বেরিয়ে যাবার যোগাড়। ডাক্তারির ভালো বই মানে ৮–১২ হাজার টাকা। 'কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে' এইরকম আর কি।
বইয়ের ভারে আটকে যাওয়া নিঃশ্বাস আর ওয়ার্ডে নতুন উপলব্ধি নিয়ে শুরু হয় চতুর্থ বর্ষ। নয়টি বিষয়, সময় মাত্র ৭ মাস এ যেন জ্বলজ্যান্ত একটা ছেলেকে পুরোদস্তুর রোবট বানিয়ে ফেলার সিলেবাস। তার ওপর NEXT পরীক্ষার খবর, যা MBBS শেষে আরেকটি জাতীয় লাইসেন্সিং পরীক্ষা।
প্রত্যেক বছরে ১৫-২০ তো ইন্টারনাল এক্সাম সবমিলিয়ে ৬০-৭০ টা অফুরন্ত VIVA , ৪ বছরে ৯ টা সেমিস্টার আর শেষমেশ ফাইনাল এমবিবিএস এক্সাম অত পরীক্ষা নেবার পরও আবার নাকি এমবিবিএস এর লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিতে হবে। এটা আমাদের সময় আন্দোলন করে বন্ধ করতে পেরেছিলাম, কিন্তু আতঙ্ক ঢুকে গিয়েছিল মস্তিষ্কের কর্টেক্সে।
এরই মাঝে ওয়ার্ডের কিছু অভিজ্ঞতা হৃদয়ে হাত রেখে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
একদিন সার্জারি ওয়ার্ডে এক রোগীর ক্ষত দেখে বুঝলাম ইনফেকশন বাড়ছে। রাউন্ডে সিনিয়র স্যারকে বলতেই উনি বললেন “এটাই ডাক্তারি, ছোট জিনিস খেয়াল করা।” ওইদিন প্রথম মনে হল আমরা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।
ইমার্জেন্সির প্রথম রাত। রাত দুটোয় রোড ট্রমা কেস এলো, সর্বত্র রক্ত। পেটের বাম পাশটা এফোঁড় ওফোঁড়। ABC (এয়ারওয়ে ব্রীদিং সার্কুলেশন) পরীক্ষা করতে গিয়ে হাত কাঁপছিল।
সিনিয়র স্যার এসে বললেন “হাত কাঁপবে, কিন্তু মন কাঁপলে চলবে না।” ওই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, ডাক্তার হওয়া মানে নিজের ভয়কে প্রতি মুহূর্তে মেরে ফেলা।
এরপর ইন্টার্নশিপে এসে দেখলাম রোগীর জীবন সম্পূর্ণ আমাদেরই হাতে।এখন আর ভুলের দাম পরীক্ষার মার্কস নয়, সরাসরি রোগীর জীবন।
মনে পড়ে ডেলিভারি রুমে নবজাতকের প্রথম কান্না না আসাতে হৃদপিণ্ড হিম হয়ে গিয়েছিল। সিনিয়র CPR (কার্ডিও পালমোনারি রিসাসসাইটেশন) দিতেই শিশুটি কেঁদে উঠল, সেই কান্না যেন আমাকে শুদ্ধ পুরো পৃথিবীকে বাঁচিয়ে দিল যেন সেই দিন। আজও সেই শব্দ আমার কানে বাজে।
একবার এক বৃদ্ধ রোগী হাত ধরে বলেছিল- “বাবা, তুমি এলেই মনে জোর পাই।” সেদিন বুঝেছিলাম ডাক্তারিতে শুধু রোগ নয়, রোগীর মনও পাওয়া যায়।
তখন বোঝা যায় রোগীর ভরসাটাও আমাদেরই দায়িত্ব।
OT তে দাঁড়িয়ে এক ঘণ্টা রিট্র্যাক্টর ধরে থাকা, এটা সত্যিকারের স্থৈর্যের পরীক্ষা।
ওখানে শিখেছি- ডাক্তারি মানে শুধু মেধা নয়, শরীর-মন-ধৈর্য সব মিলিয়ে এক মহাযুদ্ধ।
এতসবের পর যে লড়াইতে প্রতিদিন আমরা বারবার হেরে যাই সেটি হলো PG. প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ MBBS ডাক্তার পাশ করে, কিন্তু PG সিট মাত্র ৪৫ হাজার। অর্থাৎ অর্ধেক ডাক্তারই উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় না।
MBBS সিট বাড়িয়ে PG না বাড়ালে কীভাবে যথেষ্ট বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরি হবে ? এ হতাশা অধিকাংশ সত্য কাজ করার ডাক্তারদের মনে।এভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনই ভালো হবে না, হতে পারে না -এই বাস্তবতা খুব কষ্ট দেয়।
এই লেখায় ডাক্তার অর্চনা সার্মার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ডা. অর্চনা শর্মা -এক যন্ত্রণার আয়না।
রাজস্থানের গাইনোকলজিস্ট ডা. অর্চনা শর্মা PPH (পোস্ট পার্টাম হেমারেজ) -এর কারণে রোগী মারা যাওয়ার পর অন্যায় অপমানে আত্মহত্যা করেন। না জানি কত খারাপ খারাপ পেশেন্টের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ডা: অর্চনা শর্মা। কিন্তু শুধু একটা পেশেন্টের জীবন বাঁচাতে পারেননি বলে তার মতন অভিজ্ঞ একটা চিকিৎসক আমাদের হারাতে হলো।
আমার প্রিয় বন্ধু ডাক্তার ও কবি ডা: গোলাম রেজা মন্ডল ওনার একটি কবিতাই ডা: অর্চনা শর্মাকে নিয়ে লিখেছিল -
''...মৃত্যুর সাথে দাঁড়িয়ে জীবন দিতে পেরেছ -
সকল মৃত্যু পাখি তোমার হৃদয়ের সূর্যে
জীবন হয়ে ফিরে গেছে
তবু কেন গভীর অন্ধকারে
নিভে গেল - এক সূর্য ;
মৃত্যুরও মৃত্যু হয় -
কিন্তু তুমি অমর - ডা: অর্চনা শর্মা ।"
একজন চিকিৎসকের মৃত্যু মানে শুধু তো একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি পুরো সিস্টেমের ব্যর্থতার জ্বলজ্বলে উদাহরণ।
কষ্টটা তখন খুব বেশি হয় যখন সাড়ে পাঁচ বছরের ভারী পথ শেষে মানুষ বলে “খালি MBBS, পাতি ডাক্তার!” কিন্তু এই “পাতি” ডাক্তাররাই রাতবিরেতে ইমার্জেন্সিতে ছুটে আসে, রক্তে ভিজে কাজ করে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা মানুষকেগুলিকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে।
হয়ত একদিন মানুষ বুঝবে একজন ডাক্তার তৈরি হতে কত কষ্ট, কত অপমান, কত রাতজাগা, কত দায়িত্ব লাগে। হয়ত সরকার বুঝবে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে কোয়ালিটি, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এসব নিশ্চিত করাটা কত বেশি প্রয়োজন।
সেই দিনের জন্যই লড়ে যাই আমরা দিনরাত- হাসপাতালের গন্ধ, মৃত্যু, কান্না, আশার আলো এসবকিছুর মাঝে।
স্বামীজির বাণী এখনও বুকের মাঝে বাজে- “সেবাই পরম ধর্ম।”