ফিচার

মিউটেশন বা জমির রেকর্ড

আলমগীর মন্ডল
আলমগীর মন্ডল 07 Mar, 2026
২১
র্তমান সময়ে জমি জায়গা নিজের নামে রেকর্ড করে রাখা অতি প্রয়োজনীয়। তাই প্রাথমিকভাবে সম্পত্তির যে সমস্ত দলিল আছে তার মিউটেশন করে রাখা আমাদের অবশ্যকর্তব্য। 
 
    সাধারণ মানুষ রেকর্ড বা মিউটেশন সংক্রান্ত বিষয়গুলি আসলে রকেট সায়েন্সের চাইতেও জটিল ও ভীতিকর বলে মনে করে। কিছু নিয়মের বাঁধন, সঠিক তথ্য না জানা-এই বিষয়গুলোর ভয়ে সাধারণ মানুষ প্রায়ই পড়ে যান প্রতারকদের খপ্পরে , অথবা দালালচক্রের পাল্লায়। অস্বাভাবিক মোটা টাকার গচ্ছা দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতার পদ্ধিতগত কারণও যে এর পিছনে দায়ী নয় সেকথাও হলফ করে বলা যায়না।
 
    এই সকল বিষয় নিরীক্ষণ ও পর্যালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দূর করে এখন অনেক সহজ ও নির্ভুলভাবে রেকর্ড বা মিউটেশন করার জন্য নিয়ে এসেছে সরকারী পোর্টাল ‘বাঙলার ভূমি’। এখন বাড়ি থেকে বসেই নির্ভুলভাবে করা যাবে আবেদন। এবং হিয়ারিং বা শুনানির মাধ্যমে আবেদনের সত্যতা প্রমাণিত হলেই অবদানকারীর নামে হয়ে যাবে নামজারি বা রেকর্ড বা মিউটেশন।
 
    কোনো তৃতীয় পক্ষ ছাড়াই কিভাবে সম্পূর্ণ পদ্ধতিটি সফলভাবে সম্পন্ন করা যেতে পারে- আজকের আলোচনা সেই বিষয়ে। 
 
    মিউটেশন বা নামপত্তন করতে গেলে কি কি পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে এবং কি কি প্রয়োজনীয় নথিই বা তার জন্যে দরকার সে বিষয়ে ধাপে ধাপে একটা পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হল। 
 
প্রথম ধাপ : অনলাইন আবেদন ও সাবমিশন 
 
    পশ্চিমবঙ্গে জমির রেকর্ড/মিউটেশন (নামজারি) এর জন্য আবেদন এখন অনলাইন-ভিত্তিক সরকারী 'বাংলার ভূমি' ওয়েবসাইটের মাধ্যমে করা হয়। 
 
১. কিভাবে আবেদন করবেন- 
    প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি ও রাজস্ব বিষয়ক ওয়েবসাইট
 “বাংলার ভূমি ডট. গভ. ডট. ইন” -এ এবং লগইন করতে হবে। যদি আগে কখনো লগইন না করে থাকেন তাহলে নতুন ব্যবহারকারী হিসেবে মোবাইল নম্বর বা ই-মেইল দিয়ে রেজিস্টার করে নিতে হবে প্রথমে। 
 
    সেখানে “সিটিজেন সার্ভিস” এ গিয়ে “অনলাইন এপ্লিকেশন" এ ক্লিক করলেই কি বিষয়ে আবেদন করতে চাইছেন সেটি আসবে। এবারে “মিউটেশন” -এ গেলেই একটি নির্দিষ্ট ফর্ম চলে আসবে। 
 
    এখানে আবেদনকারীকে নিজের (আবেদনকারীর নাম ও ঠিকানা) ও জমির তথ্যগুলি (জেলা, ব্লক, মৌজা, দাগ নাম্বার, খতিয়ান নাম্বার, বিক্রেতা বা উত্তরাধিকারী বা দাতা -ইত্যাদি তথ্য) নির্দিষ্ট জায়গা অনুযায়ী সঠিকভাবে দিতে হবে। 
 
    সঙ্গে সঙ্গে  অনলাইন ফর্মটির নির্দিষ্ট ঘরে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের স্ক্যান করা কপি যেখানে যেমন চাইবে তেমন করে একে একে আপলোড করতে হবে। 
 
২. প্রয়োজনীয় নথি ও ডকুমেন্টস যা লাগবে
 
    সাধারণত আবেদন জমা দেয়ার সময় নিম্নলিখিত কাগজপত্র স্ক্যান কপি (পিডিএফ ফরম্যাটে) দিতে হয়। সাধারণভাবে নথিগুলি হল-
        ক)  রেজিস্টিকৃত বিক্রয় দলিল/ উপহার দলিল/ উইল বা প্রবেট সার্টিফিকেট/ হেবা নামা (আবেদনকারীর ক্ষেত্রে যেটি প্রযোজ্য হবে)
        খ)  পূর্ববর্তী মালিকের খতিয়ান / রেকর্ড অফ রাইটস (যেটি প্রযোজ্য)
        গ)  সচিত্র পরিচয় পত্র (আধার, ভোটার কার্ড ইত্যাদি)
        ঘ)  স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণপত্র 
        ঙ)  ব্যাংক একাউন্টের ডিটেইলস (নির্ধারিত ফি প্রদান করার জন্য)
        চ)  অন্যান্য প্রমাণ পত্র (চেন ডিড, ঘোষণাপত্র  ইত্যাদি যদি প্রযোজ্য হয়)
 
৩. রেকর্ড / মিউটেশনের জন্য সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট ফি প্রদান
 
    মিউটেশন ফি অনলাইনে জি আর আই পি এস/ ইউপিআই/ নেট ব্যাঙ্কিং/ ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, ইত্যাদি যে কোন মাধ্যমে প্রদান করা যেতে পারে।  
 
    এবারে ফর্মটি সাবমিট করলে আপনার আবেদন সম্পন্ন হবে। 
 
    আবেদন সফলভাবে জমা হলেই আপনি একটি এপ্লিকেশন বা রেফারেন্স নাম্বার পাবেন। এই নম্বরটি ভবিষ্যতে আবেদনের স্ট্যাটাস ট্র্যাক করার জন্য খুব প্রয়োজন।
 
দ্বিতীয় ধাপ : কেস ফাইল রেডি করা 
 
    সঠিকভাবে ফর্মটি সাবমিট হলেই আভ্যন্তরীণ সরকারী সার্ভারে একটি মিউটেশন নাম্বার তৈরি হয়। ওই মিউটেশন নাম্বারটি সংশ্লিষ্ঠ বি এল এন্ড এল আর অফিসের ভূমি সার্ভারে চলে যায় এবং সংশ্লিষ্ট অফিসের রেভিনিউ অফিসার ওই নাম্বারে একটি নোটিশ ইস্যু করে। অর্থাৎ কোন দিন হিয়ারিং বা শুনানীর -এর মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে সে বিষয়ে একটি নোটিশ জারি করে।
 
    ঐদিন আবেদনকারীকে সম্পর্কিত সমস্ত নথির জেরক্স কপি দিয়ে একটি কেস ফাইল তৈরি করে নিয়ে যেতে হবে এবং অরিজিনাল কপিগুলিকেও আধিকারিককে দেখানোর জন্য সঙ্গে রাখতে হবে।
 
    এবারে আসা যাক আবেদনপত্রের সঙ্গে কি কি প্রমাণ পত্র দিয়ে কেস ফাইল তৈরী হবে তার বিস্তারিত আলোচনায়। 
    কেস ফাইলে যে সকল কপি দিতে হবে-
i)  সেল ডিড, গিফট ডিড, ডিড সংক্রান্ত রেজিস্ট্রি দলিলের কপি
ii)  ওয়ারিশ সার্টিফিকেট এর কপি
iii)  চেন ডিড এর কপি (যদি প্রযোজ্য হয়)
iv)  নির্দিষ্ট প্লটের সার্চিং কপি
v)  আবেদন পত্রের কপি
vi)  ডিক্লিয়ারেশন এর কপি
vii)  বি.এল.আর.ও. দ্বারা ইস্যু করা নোটিশ এর কপি
vii) সার্ভিস রিটার্ন ( বি.এল.আর.ও. দ্বারা ইস্যু করা নোটিশটির একটি কপি আবেদনকারী যে আগের জমি মালিক কে রেকর্ডটির বিষয়ে অবগত করেছে তার প্রমাণ)
v, vi, vii সংক্রান্ত কাগজ গুলি আবেদন করার পর banglarbhumi.com ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে পাওয়া যাবে।
 
উপরিউক্ত বিষয়গুলি পরপর সাজিয়ে একটি কেস ফাইল তৈরি করতে হবে। এবং শুনানির দিন আধিকারিককে ফাইলটি দিতে হবে। 
 
তৃতীয় ধাপ: হিয়ারিং বা শুনানি 
 
    আগেই বলা হয়েছে আপনার আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ঠ বি.এল এন্ড এল.আর.ও. অফিসের ভূমি সার্ভারে একটি মিউটেশন নাম্বার তৈরী হয় এবং সংশ্লিষ্ট অফিসের আধিকারিক বা রেভিনিউ অফিসার ওই নাম্বারে একটি নোটিশ ইস্যু করেন। এই নোটিশটিতে হিয়ারিং বা শুনানির একটি দিন ধার্য করা হয়। 
 
    শুনানির দিন আবেদনকারী কে সশরীরে শুনানিতে হাজির থাকতে হবে কিংবা ওই দিন আবেদনকারীর কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে আবেদনকারীর দ্বারা আইনসম্মতভাবে মনোনীত কোন ব্যক্তিকে হাজির থাকতে হবে। শুনানিতে গরহাজির থাকলে আধিকারিক আবেদনটি বাতিল বলে ঘোষণা করতে পারেন। 
 
শুনানির সময় আবেদনকারীকে কেস ফাইল এ দেওয়া সমস্ত নথিগুলির অরিজিনাল বা আসল কপি সঙ্গে রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট আধিকারিক শুনানির সময় চাওয়া মাত্র আসল নথিগুলি দেখাতে হবে। 
 
শুনানি পর্বে হিয়ারিং অফিসার সমস্ত প্রমাণ যাচাই করে সন্তুষ্ট হলে আবেদনটি ডিসপোজ বা তামিল হবে। কিছুদিন পরেই আবেদনকারী দাগ বা খতিয়ান নম্বরের ভিত্তিতে সরকারী ওয়েবসাইটটিতে তার নাম রেকর্ডভুক্ত হয়েছে দেখতে পাবে। 
 
প্রক্রিয়াটিতে সাধারণত ১৫-৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। কোন কোন ক্ষেত্রে আরো বেশী সময় লাগা খুবই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে সময় লাগাটা কোনও দুশ্চিন্তা বা নিরাশার বিষয় নয়। 
উচ্চ শ্রেণীর ভূত তাড়ানোর উপায়
বিশেষভাবে মনে রাখার বিষয়
 
   . দেশের একজন নাগরিক বিভিন্নভাবে জমির মালিক হতে পারে। প্রকৃত বৈধ মালিকদের থেকে দলিল করে জমি কিনে যেমন মালিক হতে পারে, তেমনি দানপত্র দলিল দ্বারাও মালিক হতে পারেন। এছাড়াও বিনিময় দলিল মূলেও কেউ জমির মালিক হতে পারে। দরখাস্তের সময় মূল দলিলের ফটোকপি অবশ্যই জমা দিতে হবে।
    
    ২. যদি প্রকৃত মালিক বা বৈধ মালিকের মৃত্যু হয় তাহলে তার স্ত্রী,পুত্র, কন্যা ইত্যাদি উত্তরাধিকারীগণ যৌথভাবে সেই সম্পত্তির মালিক হন তবে ওই উত্তরাধিকারীগণ ইচ্ছা করলে সম্পত্তির পার্টিশন দলিল বা বন্টন নামা করে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে রেকর্ড ভুক্ত রায়তের মৃত্যুর সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশ সার্টিফিকেট লাগবে। শুনানির সময়ও আধিকারিক এই সার্টিফিকেট দেখতে চাইবেন। 
 
    ৩. প্রকৃত ও বৈধ মালিকের উইল বা ইচ্ছাপত্রের সূত্রেও তার মৃত্যুর পর জেলা ডেলিগেট আদালত থেকে প্রবেট সার্টিফিকেট বের করে আনা যায়। সেই প্রবেট সার্টিফিকেট ও মালিকানা দলিলের সমতুল হিসেবে বিবেচিত হয়। সেক্ষেত্রে প্রবেট সার্টিফিকেটের আসল কপি সঙ্গে রাখতে হবে। 
 
    ৪. এছাড়া দখল-স্বত্বের মামলায় আদালতে চূড়ান্ত জয় লাভ করে থাকলে বা ডিগ্রী হয়ে থাকলে, অথবা আদালতের রায়ের ভিত্তিতে দখল প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, সেই রায়ের ভিত্তিতে বি.এল.আর.ও. -এর কাছে মালিকানার বৈধ দাবী করা যায়। এক্ষেত্রেও আদালতপ্রদত্ত অর্ডারটির আসল কপিটি সঙ্গে রাখতে হবে। 
 
কিছু ব্যতিক্রমী বিষয় নিয়ে আলোচনা
 
    মূল দলিল হাতে না থাকলে কি করণীয়
ক্রয় কৃত জমি বা দানপ্রাপ্ত জমি বা পারিবারিক বন্টন আমার সূত্রে প্রাপ্ত জমির সমর্থনে একটি রেজিস্ট্রি দলিল থাকার কথা। যদি না থাকে তাহলে ওই দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলে আবেদন পত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। সার্টিফাইড কপিটি অনেক পুরনো সময়ের হলে ডিস্ট্রিক্ট সাব রেজিস্টার অফিসে দলিল নম্বর এবং সাল থেকে খুঁজে বের করে সার্টিফাইড কপি দেওয়া হয়।
 
     পৈতৃক জমি কিভাবে রেকর্ড হয়
পরিবারের পিতা যদি ইনটেস্ট অবস্থায় মারা যায় অর্থাৎ মারা যাওয়ার আগে যদি কোন উইল বা জমির বন্দোবস্ত না করে দিয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে পিতার নামে পর্চা থাকলে পিতার অবর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানদের জমির উত্তরাধিকারী হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির জন্মদাত্রী মা বেঁচে থাকলে তিনিও এই জমির উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হবেন। এক্ষেত্রে ওয়ারিশ সার্টিফিকেট আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
 
    এরপর নির্দিষ্ট ধর্ম-সম্প্রদায় উত্তরাধিকার নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি রেকর্ড হবে। 
 
    হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাগণ সমান হারে সম্পত্তির ভাগ পাবে। 
 
    মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পাবে মোট সম্পত্তির আট ভাগের একভাগ। পুত্র বা পুত্রগণ পাবে কন্যাদের দ্বিগুণ হারে। এটি সাধারণ নিয়ম। 
 
    মনে রাখা প্রয়োজন, পৈতৃক জমিতে সকল উত্তরাধিকারীর সকল দাগে অধিকার থাকে। একে এজমালি অধিকার বলে। এই এজমালি অধিকার বা স্বত্বটিকে যদি দাগ ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট করতে হয় কিম্বা যৌথ অধিকার কে ভিন্ন ভিন্ন অংশে সীমাবদ্ধ করতে হয় সেক্ষেত্রে একটি রেজিস্ট্রিকৃত বন্টননামা করাতে হবে। 
 
    তাহলে দেখা যাচ্ছে খুব সহজেই নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে ধাপগুলো যথাযথভাবে পালন করলেই তৃতীয় পক্ষের মুখাপেক্ষী না হয়ে আপনি নিজের জমির রেকর্ড / মিউটেশন নিজেই করে নিতে পারবেন। 
 
    জমির উপর প্রকৃত অধিকার শুধু দলিলে নয়, সরকারী রেকর্ডে নিজের নাম থাকলে তবেই তা সম্পূর্ণ হয়। মিউটেশন বা রেকর্ড হল সেই আইনী সম্পূর্ণতার স্বীকৃতি। নিজের জমি, নিজের অধিকার - সরকারী রেকর্ডে নাম নথিবদ্ধকরণ হল তার সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ।
আলমগীর মন্ডল

আলমগীর মন্ডল

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।