সমাজ

শ্বাস ভরে যায় উন্নয়নে

স্নিগ্ধা বিশ্বাস
স্নিগ্ধা বিশ্বাস 08 Mar, 2026
১৬
মাদের দেশে পরিবেশ দূষণ এখন আর কোন সতর্কবার্তা নয়, বরং যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্থায়ী অংশ।
 
    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দূষিত শহরের মধ্যে প্রায় ১৪টিই ভারতের। এই তালিকায় আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ উপস্থিতি এতটাই নিয়মিত যে না থাকলে বরং কেমন একটা সন্দেহ হয়।
 
    প্রতি বছর বায়ুদূষণের কারণে দেশে আনুমানিক ১০-১২ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে, তবুও আমরা নির্বিকার। তথাকথিত উন্নয়নের জয়ধ্বজা সরাসরি ভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত !
 
    বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বহু শহরে PM 2.5 এর মাত্রা WHO নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় অন্তত ৫-৬ গুণ বেশি। বাতাস এতটাই ভারী যে শ্বাস নিতে গেলে মনে হয় ফুসফুসে EMI বসানো হচ্ছে।
 
    দিল্লী, কানপুর, লখনউয়ের সঙ্গে কলকাতাও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ (CPCB)-এর তথ্য অনুযায়ী, শীতকালে কলকাতায় AQI প্রায়ই ২০০–৩০০ ছাড়িয়ে যায়, কোথাও কোথাও বা ৩৫০ ছুঁয়ে ফেলে। বিজ্ঞানের ভাষায একে বলে ‘অতি অস্বাস্থ্যকর’, আর শহরবাসীর ভাষায়, “আজ আবার বাইরে বেরোন যাবেনা না।”
 
    জলদূষণের ছবিটাও এর চেয়ে কিছু কম রঙিন নয়। CPCB-এর তথ্য বলছে, আমাদের প্রিয় গঙ্গা নদীর বহু অংশের জলই আর স্নানযোগ্য নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মিলিয়ন লিটার শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত নিকাশি জল নদীতে ফেলা হয়। ফলে গঙ্গা এখন শুধু পবিত্র নদী নয়, একেবারে ‘মাল্টিপারপাস ড্রেনেজ সিস্টেম’।
 
    এতে কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েডের মতো জল বাহিত রোগ বাড়ছে। ফলে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যে নদী যেমন ভরছে, হাসপাতালের বেডও তেমনই পাল্লা দিয়ে ভর্তি হচ্ছে।
 
    কিন্তু দূষণের গল্প এখানেই শেষ নয়। বাতাস ও জলের পর মাটিতে আসা যাক।  মাটি দূষণ মানুষের দ্বারা সবচাইতে বেশি অবহেলিত। মাটি তো চুপচাপ সব সহ্য করে। কিন্তু মাটির প্রতিশোধ আরো ভয়ংকর ধীরগতির বিষক্রিয়ার মত।  
 
    পরিবেশ দপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, অতিরিক্ত অবৈধ রাসায়নিক সার, কীটনাশক, প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যের ফলে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি শুধুমাত্র তার উর্বরতাই হারাচ্ছে না বরং তার প্রাকৃতিক চরিত্র হারাচ্ছে। কৃষিজমিগুলি এখন বিষের গুদাম।
 
    ফসল ফলছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে বিনামূল্যে আসছে বিষাক্ত মাইক্রো পলিমার, ক্লোরপাইরিফস (Chlorpyrifos), ম্যালাথিয়ন (Malathion), কার্বোফুরান (Carbofuran), ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid),ক্যাডমিয়াম (Cadmium), আর্সেনিক (Arsenic), গ্লাইফোসেট (Glyphosate), নাইট্রাইট জাতীয় বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ধাতু যার অবশ্যম্ভাবী ফল হল শিশুদের মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, বন্ধ্যাত্ব, থাইরয়েড সমস্যা, মেয়েদের অনিয়মিত পিরিয়ড, পুরুষদের শুক্রাণু কমে যাওয়া এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি ভয়ংকর ভাবে বেড়ে যাওয়া। 
 
    একেবারে ‘কম্বো অফার’। মানুষ ভাবছে, “খাবার পাচ্ছি, এই যথেষ্ট,” মাটি ভাবছে, “আমাকে যা দিবে তাই তোমাদের ফিরিয়ে দেব” । 
 
    পরিবেশ মন্ত্রকের রিপোর্ট আরও জানাচ্ছে লাগাতার গাছ কাটার ফলে সবুজ আচ্ছাদন কমছে, বাড়ছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’। ফাঁকা প্রচারণার 'এক পেড় মা কি নাম' এর গল্পে যদিবা একটা গাছ লাগানো হচ্ছে তো 'হাজার পেড় বাপ কি নাম' পে লক্ষ লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, হাজার হাজার একর বনভূমি ফর্সা করে ফেলা হচ্ছে।
 
    সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের নাসিক মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের উদ্যোগে গোদাবরী নদী বরাবর সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান করার জন্য কাটা হয় প্রায় ১২৭৩ টি গাছ, কুম্ভ মেলায় 'সাধু গ্রাম' তৈরির উদ্দেশ্যে কাটা হয় প্রায় ১৭০০ গাছ, গুজরাতের আমেদাবাদে অবৈধভাবে কাটা হয় প্রায় ২২০০ গাছ, তেলেঙ্গানা তে প্রায় ৪০০ একরের 'গাছি-বাউলি' বনভূমি কাটা শুরু হয় একেবারে সরকারি উদ্যোগে, মধ্যপ্রদেশের সিংরৌলি এলাকায় কয়লা খনি সম্প্রসারণের নামে লক্ষ গাছ কাটা হয়েছে  আদানীদের স্বার্থে। 
 
    কলকাতার মতো শহরে গত কয়েক দশকে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১-১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। সূর্যদেবও বোধহয় বলছেন, “এত গরম আমি দিইনি, বাকিটা তোমরাই বানিয়েছ!”
thescroll.in
    এই সব ভয়াবহ তথ্যের মাঝেই শহরে চলছে এক রমরমা উন্নয়ন-উৎসব। এখন শহরে গাছ কাটার শব্দই যেন উন্নয়নের থিম মিউজিক। যেখানে একসময় ছায়া দেওয়া গাছ ছিল, সেখানে আজ দু-তিনটে ফ্ল্যাট, একটা পার্কিং আর ‘লাক্সারি লাইফস্টাইল’ লেখা হোর্ডিং না থাকলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ বলে ধরা হয়। সকালে পাখির ডাক নয়, করাতের “কাট কাট” শব্দেই  দিন শুরু হয়, কারণ পাখি উড়ে গেছে, উন্নয়ন থেকে গেছে।
 
    নির্মাণ সংস্থাগুলি গাছের প্রতি এতটাই সহানুভূতিশীল যে তাদের আর রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে দেয় না, একেবারে কেটে দিয়ে চিরমুক্তি দেয়। শহরবাসীরাও খুশি। গাছ অক্সিজেন দিত ঠিকই, কিন্তু ফ্ল্যাট দেয় লিফট, পার্কিং আর মাসিক EMI, আর মাথায় বোঝাভর্তি 'স্ট্যাটাস'। আধুনিক জীবনে অক্সিজেন ফ্রি হলে তার দাম নেই, কিন্তু EMI থাকলেই সেটা ‘ভ্যালু ফর মানি’।
 
    গাছগুলো, মাটি আর নদী হয়তো একসঙ্গে বসে ভাবছে -আমরা জীবন দিলাম, আর মানুষ আমাদের বদলে কংক্রিটকে আপন করে নিল। 
 
    এর ফল হিসেবে শহরের সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, মাটি বিষাক্ত হচ্ছে, বাতাস ভারী হচ্ছে, আর আমরা গর্ব করে বলছি, “দেখুন, কত উন্নয়ন!” পরিবেশবিদরা সতর্ক করছেন, টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যতের উন্নত শহরে সব থাকবে- ফ্ল্যাট, লিফট, EMIশুধু থাকবে না বিশুদ্ধ বাতাস, জল আর সুস্থ মাটি।
 
    আমরা গাছ কাটি উন্নয়নের নামে, তারপর আবার অক্সিজেন কিনে শ্বাস নিই। নদীতে বিষ ঢালি, আর পরে “মিনারেল ওয়াটার” খুঁজে বেড়াই। গাড়ি চালিয়ে দ্রুত পৌঁছাতে চাই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাই  হাসপাতালে। 
 
    দূষণ আসলে মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ।
 
    গাছ,নদী,মাটি বিনা বেতনে ২৪ ঘণ্টা মানুষের জন্য কাজ করে, আর মানুষ টাকা দিয়ে তাকে কেটে ফেলে। প্রকৃতি কখনও আমাদের বিল পাঠায় না, কিন্তু দূষণ ঠিকই তার প্রতিশোধ সুদে-আসলে আদায় করে নেয়।
স্নিগ্ধা বিশ্বাস

স্নিগ্ধা বিশ্বাস

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।