সংস্কৃতি
কৌরব জননী
"ততঃ সা গর্ভমুৎসৃজ্য
শিলায়ামভ্যপাতয়ত্ ।
ততো দুর্ধর্ষণো নাম
জাতঃ পাপসমুদ্ভবঃ ॥
(আদিপর্ব, মহাভারত)
#
“পাপসমুদ্ভব” - কোন পাপ ? কোন পাপ নিয়ে জন্ম নিল "দুর্ধর্ষণ"?
দীর্ঘ গর্ভধারণের অসংযম, নাকি ব্যাসদেবের প্রতি অবিশ্বাস। অথবা সিংহাসন লোভে সন্তান কামনার আসক্তি? গান্ধার কন্যার কোন পাপ প্রসূত হল "দুর্ধর্ষণ" প্রসবের মধ্যে দিয়ে!
মহাভারতের পরতে পরতে মিশে রয়েছে নারীকূলের প্রেম, ত্যাগ, যন্ত্রণা ও প্রতিহিংসার গল্প। সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র গান্ধারী। যাকে কুরু বংশের ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে খুব সহজেই চিহ্নিত করা হয়।
কুরুবংশের জ্যেষ্ঠ, শক্তিশালী ও যোগ্য রাজপুরুষ জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে কোন আপত্তি করেননি গান্ধারী। এ নিয়ে গান্ধারকন্যার অভিমানের কোন ইঙ্গিত ব্যাসদেব অন্তত কোথাও দেননি। পিতৃকুল ও কৌরবকুলের খ্যাতি মাথায় নিয়ে অন্ধ যুবরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে গ্রহণ করার মধ্যে গান্ধারীর নারী চেতনার চেয়েও অনেক বেশি ব্যক্তিত্বের চেতনা প্রকাশিত।
অন্ধ যুবরাজের প্রতি কিছুটা মায়ায় কিছুটা আত্মনিবেদনে হয়তো ভেবেছিলেন পার্থিব সব রঙিন বিষয়গুলি আত্মস্থ করার প্রয়োজন নেই আর। এক খণ্ড পট্টবস্ত্র চোখে বেঁধে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাভারতীয় ইতিহাসে তপস্বিনী, সংযমী ও ধর্মপরায়ণা নারী হিসেবে চিত্রিত হতে আর দেরি হয়নি তার।
কিন্তু এই ত্যাগের যে অবশ্যম্ভাবী অহংকার, মানবিক গান্ধারী কি কখনও সেটা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন? নাকি ক্রমশ জমতে থাকা আত্মবঞ্চনার ক্ষোভ অস্থির করে তুলছিল তাকে?
হস্তিনাপুরের অলিন্দে সেদিন চাপা আনন্দের বাতাস। পাণ্ডুপত্নী কুন্তীর গর্ভে প্রসূত হয়েছে হস্তিনাপুর এর উত্তরাধিকার।
নীরবে নিজের স্ফুরিত উদর স্পর্শ করলেন সৌবলী। ঈর্ষা নয়, ক্ষোভ নয় বরং সে স্পর্শে ছিল এক গভীর অবমাননার অনুভূতি। বহু বছর থেকে এ গর্ভ-ভার বয়ে আসছেন তিনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, দমিত বাসনা ও অদৃষ্টের অবিচারে ভেঙে পড়ল দীর্ঘ লালিত সংযম।
"সা অমর্ষবশমাপন্না দীর্ঘকালং ধৃতং গর্ভম্ ।
পাতয়ামাস ভুবি ক্রুদ্ধা শিলয়া সহসা ॥"
দীর্ঘকাল ধরে ধারণ করা গর্ভকে, অসহনীয় ক্ষোভ ও অভিমানের বশে ক্রুদ্ধ গান্ধারী হঠাৎই পাথরের উপর নিক্ষেপ করলেন। এই একটিমাত্র শ্লোকেই ব্যাসদেব তুলে ধরেছেন গান্ধারীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি, দমিত যন্ত্রণা এবং ক্রোধের আকস্মিক বিস্ফোরণ বোঝাতে।
পাষাণাঘাতের গর্ভপাতে ভূমিষ্ঠ হলো একখণ্ড মাংসপিণ্ড। মহর্ষি ব্যাসদেবের কলাকৌশলে, ১০০ টি সমখণ্ড এবং ১ টি অসম খন্ডে পিণ্ডগুলি প্রিজার্ভ করা হয় ঘৃতমন্ডিত কুম্ভ পাত্রে।
"জজ্ঞে চাশ্বতরো যদ্বৎ শব্দং কুর্বন্ মহারবম্ ।
উলূকশ্চাপি শব্দং চ চক্রুঃ সর্বে দিশো দশ ॥"
"খচ্চরের মতো ভয়ংকর শব্দ করতে করতে, পেঁচাদের অশুভ ধ্বনির মধ্যে দিয়ে" কুম্ভ পাত্র ভেঙে যে প্রথম শিশুটি ভূমিষ্ঠ হলো সেই-ই দুর্যোধন। বাকি ৯৯ টি পিন্ড থেকে অন্যান্য পুত্রেরা এবং অসম পিণ্ডটি থেকে দুঃশলা ভূমিষ্ঠ হল।
কিন্তু গান্ধারীর কোন অন্যায়, কোন অপকর্ম, কোন পাপ থেকে ঘটল এমন ঘটনা? সমস্ত পাওয়া থেকে বঞ্চিত গান্ধারীর 'ক্রোধ'জাত পাপ? অন্তত ব্যাসদেব তো মহাভারতে সেভাবেই দেখিয়েছেন। কালে কালে পাঠকরা নিশ্চয়ই এর পুনর্মূল্যায়ন করবেন।
"যথা মে নিহতাঃ পুত্রাঃ
তবাপি কুলসংক্ষয়ঃ ।
ভবিষ্যতি ন সন্দেহো
এতৎ সত্যং ব্রবীমি তে ॥"
( স্ত্রী পর্ব, মহাভারত)

#
ধর্মযুদ্ধ শেষ। নিয়তির পরিকল্পনা অনুসারেই কৌরবরা পরাজিত-নিহত।
শতপুত্রশোকে দগ্ধ গান্ধারী কৃষ্ণকে সম্বোধন করে বলেন "হে কৃষ্ণ তুমি ইচ্ছা করলেই যুদ্ধ ঠেকাতে পারতে কিন্তু তুমি তা করনি"। "তুমি অনার্য। তোমার চক্রান্তে আমার দূর্যোধনের উরু ভীম ভঙ্গ করেছে। তোমার চক্রান্তে গুরু দ্রোণাচার্য নিহত হয়েছে। তোমার চক্রান্তে কর্ণকে অন্যায় ভাবে বধ করেছে অর্জুন। তুমি অনার্য। তুমি অন্যায়কারী।"
তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহায় কৃষ্ণকে অভিশাপ দিলেন-
"হে কৃষ্ণ, আমার পুত্রেরা যেমন নিহত হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে তোমার বংশেরও বিনাশ হবে— এতে কোনো সন্দেহ নেই, আমি তোমাকে সত্যই বলছি॥"
কৃষ্ণ তার উত্তরে বলেন- “আমি চেয়েও যুদ্ধ থামাতে পারিনি...আর তুমিও পুত্রদের অন্যায়ে নীরব থেকেছিলে”।স্থিতধী কৃষ্ণ গান্ধারীকে বলে চলেন "তবে যুদ্ধের নিয়ম কি? কোন ন্যায় পাণ্ডবরা করবে? অভিমুন্য বধ কি ন্যায় ছিল? রাজবধূ দ্রৌপদীকে উরুপ্রদর্শনে চুলের মুঠি ধরে ভরা সভায় শ্লীলতাহানি কি ন্যায়? সেই অন্যায়কারী কৌরবদের রাজমাতা তুমি, তোমারও দায় আছে। তোমার হিংসার বীজ তুমি গর্ভেই বপন করেছিলে।"
তবে কি গান্ধারীর গর্ভেই নিহিত ছিল কৌরব বংশ ধ্বংসের বীজ? "পাপসমুদ্ভবঃ"? নবপরিণীতা ধৃতরাষ্ট্রপত্নী থেকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত কৌরব রাজমাতা গান্ধারীর দীর্ঘ যাত্রা ছিল নিতান্তই পাপ-পঙ্কিল? নাকি পৃথিবীর প্রতিটি মায়ের মতই তিনি চেয়েছিলেন "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে"?
সুসন্তান বা কুসন্তান গড়ে ওঠার পেছনে একজন মায়ের দায় যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনই একজন মায়ের গর্ভজাত সন্তানকে তার পাপের ফল বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় কি? এ প্রশ্ন রয়ে যাবে।
কুপুত্র যদাপি বটে, কুমাতা কদাপি নহে।