সংস্কৃতি

বাউল নামা

শুভ বাউল (শুভাশিস বসু)
শুভ বাউল (শুভাশিস বসু) 07 Mar, 2026
১৮
বাউল একটি জীবন দর্শন, জীবন বোধ, জীবন যাপন ও সাধন পথ। সহজতা, সরলতা প্রেমই বাউল দর্শনের ভিত। বৌদ্ধ সহজিয়া থেকে বাউল মতের আগমন।আউল-বাউল-ফকির-দরবেশ-সাঁই খুবই কাছাকাছি ও প্রায় সমসাময়িক।
 
    বাউল নামের উৎপত্তি নিয়ে ফোকলোরবিদ-দের মধ্যে মতভেদ আছে। বাউল চৈতন্যচরিতামৃতে খ্যাপা ও বাহ্যজ্ঞানহীন অর্থে বাউল শব্দের প্রয়োগ প্রথম লক্ষ্য করা যায়, আবার শ্রীচৈতন্যদেবের কাছে প্রেরিত অদ্বৈত আচার্যের একটি হেঁয়ালিতেও বাউল শব্দের উল্লেখ ছিল। কারো মতে আবার এলোমেলো, বিশৃঙ্খল, পাগল প্রভৃতি অর্থে বাউর থেকে বাউল নামের উৎপত্তি হয়েছে।
 
    অবশ্য উত্তর ভারতের বাউলার সাথে আমাদের বাউর এর যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে তাই আকুর থেকে আউল ও ব্যাকুর থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি হওয়াও অসম্ভব নয়। কারো কারো মতে বাউল মতের উদ্ভব যুগে, দিন-দুখী উলুঝুল একতারা বাজিয়েদের  লোকে বাতুল বলে উপহাস করতো। এ বাতুল থেকেই নাকি বাউল নামের উদ্ভব।
 
    আবার কেউ কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন বায়ু শব্দের সঙ্গে স্বার্থে ল যুক্ত হয়ে বায়ুভোজী উন্মাদ কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাস দ্বারা সাধনাকারী অর্থে বাউল শব্দ তৈরি হয়েছে।
 
    বাউল শব্দটি আউল শব্দজ বলে মনে করারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একসময় বাউলেরা প্রায়ই অশিক্ষিত ছিল। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত বাউল আছে। বাউলদের লিখিত শাস্ত্র , ইতিহাস বা দর্শন নেই। তাই তারা কোন প্রশ্নের পুঁথিগত উত্তর দিতে পারে না।
 
    প্রজ্ঞা উপায়ে এর পরিবর্তে রাধা কৃষ্ণ প্রতীকে সাধনা চৈতন্য-পূর্ব যুগেই শুরু হলেও চৈতন্যত্তরকালেই এ সম্প্রদায়ের প্রকাশ প্রসার ঘটে। বাউল সম্প্রদায়ের সামাজিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যেসব প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ ও হিন্দু একসময় ইসলাম কবুল করেছিল এবং যেসব বৌদ্ধ হিন্দু সমাজচ্যুত হয়েও নিজ পূর্বপুরুষের ধর্মাচরনে রত ছিল, তারাই কালে কালে বাউল সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েছে। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের  সার্বজনিক উত্তরাধিকার ছিল না বলেই হিন্দু-মুসলমানের মিলনে বাউল মত গড়ে উঠতে পেরেছে। 
 
    হিন্দু প্রভাবে  রাধা-কৃষ্ণ, শিব-শিবানি, মায়া-ব্রহ্মা, বিষ্ণু-লক্ষী ইত্যাদি তাদের চিরাচরিত অর্ধনারীশ্বর চরিত্র ছাড়িয়ে পুরুষ প্রকৃতি হিসেবে বাউল গানে প্রতীক রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। মুসলিম প্রভাবে তেমনি মোকাম, মঞ্জিল, লতিফা, সিরাজুম-মুনিরা, আল্লাহ, কাদের গণী, রুহ, রাসুল, আনাল হক, আদম-হাওয়া, মুহাম্মদ-খাদিজা, আলী-ফাতেমা ইত্যাদি একইভাবে প্রতীকি রূপকে গৃহীত হয়েছে। আবার বৌদ্ধ ধর্মের নাথ এবং নিরঞ্জনও পরিত্যক্ত হয়নি।
 
    এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পৌরাণিক উপমা ও কুরআন হাদিসের বাণীর নানা ইঙ্গিতবহ রূপক। অবশ্য বাউল রচনায় এসব শব্দ ও পরিভাষা তাদের 'সত্যানুগ' তথা নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। বৈষ্ণব ও সুফি সাধনার সঙ্গে বাউল মতের মৌলিক পার্থক্য বর্তমান। 
 
    সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধি পরিহার করে বাউল বাসরে যে মিলনমেলা তৈরি হয়েছে, তাকে সার্থক ও স্থায়ী করতে পরমাত্মা বা উপাস্যের নামেও এক সার্বজনীন পরিভাষা সৃষ্টি হয়েছে।
 
    বাউলের ভাষায় পরমতত্ত্ব পরমেশ্বর বা স্বচ্ছিদানন্দ হচ্ছে মানুষ, অটল মানুষ, সহজ মানুষ, অধর মানুষ,রসের মানুষ, ভাবের মানুষ, মনের মানুষ, অলকসাঁই, অচিন পাখি, মনুরা, প্রভৃতি পরমাত্মা বা আত্মারই পূর্ণরূপ। আর এ বিষয়ে সম্প্রদায়ের ব্যাখ্যা হচ্ছে দেহস্থিত আত্মাকে কিংবা আত্মা সম্বলিত নরদেহকে যখন মানুষ বলে অভিহিত করা হয়, তখন পূর্ণাঙ্গ বা অখন্ড আত্মা বা পরমাত্মাকে মানুষ বলতে বাধা কি ?
 
    বিভিন্ন বিপরীতধর্মী মতবাদের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাউল মত। হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিমদের পরম মিলনে গড়ে উঠেছে বাউল সম্প্রদায়। তাই পরম সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গ্রহণশীলতা,  বোধের বিচিত্রতা, মনের ব্যাপকতা ও উদার সদাশয়তা এই সম্প্রদায়ের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
 
    মনুষ্য নির্বিশেষকে এমন উদার দৃষ্টিতে দেখা যে জীবন বোধের দ্বারা সম্ভব তার উৎস যে ধর্মমত বা মরমিয়াবাদ তা কখনো তুচ্ছ হতে পারে না। মুসলমান বাউলের হিন্দু গুরু, হিন্দু বাউলের মুসলমান গুরু, এমন প্রায়শই দেখা যায়। বাউল ধর্মে বৈরাগ্য নেই। বাউলেরা মুখ্যত তাত্ত্বিক, গৌণত প্রেমিক। এই তাত্ত্বিকতা অনেক বিষয়ে তাদেরকে অনাসক্ত ও নিরাসক্ত রাখে, তাই সাধারণত দুই ধরনের বাউল চোখে পড়ে, গৃহী ও বৈরাগী।
 
    বাউল বৈরাগীরা সাধারণত ভিক্ষাজীবী, ভবঘুরে। গৃহীরা নিজস্ব গোষ্ঠীগতভাবে সামাজিক।  বাউলতত্ত্ব বাংলার নিজস্ব ধর্ম, বাঙালীর ব্যক্তিগত আবেগ, একান্তভাবেই মন-উচাটন বাঙালীর জীবনবিন্যাস।
thescroll.in
    বাউল গানের তাত্ত্বিক রচনা তত্ত্বসাহিত্য। স্বল্পশিক্ষিত লোকের রচনা বলে এগুলি লোকসাহিত্যের উপরে উঠতে পারেনি। পদাবলী যেমন আঙ্গিকসৌষ্ঠবে, ভাবের সুষম অভিব্যাক্তিতে, কাব্যরসে, শিল্পসৌন্দর্য, ছন্দলালিত্যে ও সুচিত শব্দ সম্পদে উৎকৃষ্ট কবিতার লাবণ্য লাভ করেছে,  বাউল গানের তেমন সৌভাগ্য হয়নি। আঙ্গিকে ছন্দে ও অভিব্যক্তির অসঙ্গতিতে এবং শিল্প রুচির অভাবে অধিকাংশ রচনা-ই কবিতার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি।
 
    অবশ্য ব্যতিক্রমও যে নেই তেমন নয়। বিশেষ করে লালন, পাঞ্জু শাহ্, হাওরে মদন, যাদু বিন্দুসা, ভবা পাগলা, সদানন্দ মনমোহন আরো আরো প্রচুর মহাজনের রচনায় কাব্য মাধুর্য দুর্লভ নয়। তবে সাহিত্য হিসেবে বিচার করলে বাউল গানের লালিত্য বিরল লোকগীতি মাত্র।
 
    বাউল গানের আসল কদর  তার দার্শনিকতা ও তত্ত্বপ্রিয়তায়। মানুষের কাছে বাউল গানের সার্বিক উপস্থিতি গান হিসেবে যতটা নয় তার চেয়ে বেশি তত্ত্বকথার আশ্রয় হিসেবে। বাউলেরা গানকে তত্ত্ব প্রচারের, ভজনের ও আত্মবোধনের কাজে উৎসর্গ করে।
 
    বাউল মতে আত্মা ও পরমাত্মা অভিন্ন অর্থাৎ আত্মা পরমাত্মার অংশ। আত্মাকে জানলে পরমাত্মাকেই জানা হয়। এই দেহস্থিত আত্মাই হল মানুষ  -মনের মানুষ, রসের মানুষ, ভাবের মানুষ। আর বাউলেরা যুগে যুগে  তার অনুসন্ধানে বিভোর। 
 
    এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জীবন সীমিত। একটা নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত জীবনের সঙ্গে তার সহবাস। এই জর পৃথিবীতে মানুষের জীবন শুধু  ক্ষয়িষ্ণুতার পরিবৃত্তে শৃঙ্খলিত। পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ মানুষকে আপাত শান্তির সন্ধান দেয় বটে কিন্তু তার বৃহত্তর জীবনের জন্য সঞ্চয় কিছুই রাখে না। বাউল মতে সেই সঞ্চয়ের পথ হল প্রজ্ঞার পথ। এই পথই বেছে নিয়েছে বাউল-ফকিররা। আত্মগত হয়ে তার "মনের মানুষ" সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ভগবান ও আল্লাহতালার ধ্যানের মাঝেই তারা খুঁজে ফিরে জীবনের শ্রেষ্ঠতম লাভের পথ। 
 
    এই পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এ পথ যাকে ডাক দিয়েছে তার সব তার ছিঁড়ে গিয়েছে, সব তাকে ছেড়ে গিয়েছে। সৃষ্টিছাড়া সংসার বিরাগী হয়ে সে কেবল তার পরম পুরুষের বীণার তারে সুর সংযোজন করতে মেতে উঠেছে। তার আমিত্বের মৃত্যু হয়েছে। মুক্ত হয়েছে তার আত্মা। আর এই মুক্তির আনন্দেই সে বেঁচেছে চিরকাল।
 
    বাউল-ফকির মুক্তি পেয়েছে ঠিকই কিন্তু শান্তি পায়নি। মনের মানুষের কাছে নিজেকে নিবেদন করতে না পারা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। নিরন্তর সে সেই পরম মানুষটির খোঁজ করে চলেছে।
 
"আমার মনের মানুষ যে রে, আমি কোথায় পাব তারে"
 
    এই মনের মানুষের সন্ধানে বাউলরা অনন্তকাল ধরে পথ পেরিয়ে চলেছে। তার যাত্রার বিরাম নেই। তার পথ নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে। সে চলেছে অজানা লোকের পথে। তার পথ জ্যোতির্ময়ের আলোকে উদ্ভাসিত, কিন্তু জ্যোতির্ময় তাকে ধরা দেন নি, ধরা দিয়েও তাকে ধরা দিচ্ছেন না। শুরু হয়েছে লুকোচুরি খেলা। 
 
    এই জ্যোতির্ময়কে, এই পরম মানুষ মনের মানুষকে ধরাছোঁয়া যে সহজ নয় বাউল ফকির তা জানে। আর জানে বলেই গুরু বেছে নিতে হয় তাকে। এমন একজনকে যার কাছে জ্যোতির্ময় অনেক আগেই ধরা দিয়েছেন। এই পৃথিবীর জন্য যিনি শান্তির বার্তা বাহক তিনিই হচ্ছেন বাউল এর গুরু। 
 
    আমরা বাউলদের মধ্যে এক পরিপূর্ণ নিয়ম তন্ত্রের পরিচয় পাই। অতি সুন্দর সুষ্ঠুভাবে নিজেদের জীবনচর্যায় তারা জ্যোতির্ময়ের ধ্যান করে চলেছে। বাউলেরা বিশ্বাস করে এই মহা মহাবিশ্বের সৃষ্টি শুধুমাত্র একটা অঘটনজনিত ঘটনা নয় বরং একটি সংঘটন। যার হাতে এর পরিচালন ভার তিনি বড় নিয়ম তান্ত্রিক সুতরাং তাকে পাওয়ার পথই হলো নিয়মতন্ত্রের পথ।
 
    বাউলেরা ফকিরেরা স্রষ্টার প্রতি সম্পূর্ণরূপে সমর্পিত। এই আকূল আত্মনিবেদন, একান্ত আত্মসমর্পন ও গভীরতম নির্ভরের ভাবই বাউল-ফকিরদের গানে মূর্ত্ত হয়ে ওঠে। 
 
"আছে যার মনের মানুষ মনের তোলা, 
সে কিরে পাগলা ভোলা 
অতি নির্জনে সে বসে কেবল করছে খেলা।"
 
 
শুভ বাউল (শুভাশিস বসু)

শুভ বাউল (শুভাশিস বসু)

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।