পুনর্জীবনের খোঁজে
পুনর্জীবিত হওয়ার আশায় কয়েকশো মানুষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের মৃতদেহকে সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে এক গবেষণা সংস্থাকে।
এই মৃতদেহ সংরক্ষণ পদ্ধতির নাম ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন (Cryopreservation)। Cryonics হলো মৃতদেহ বা মস্তিষ্ক (brain) খুব কম তাপমাত্রায় (প্রায় −196 °C, লিকুইড নাইট্রোজেনে) সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি, যাতে ভবিষ্যতে যদি বিজ্ঞান যথেষ্ট উন্নত হয় তবে হয়তো পুনরুজ্জীবন (revival) সম্ভব হতে পারে।
এই freezing পদ্ধতিতে, মৃতদেহের রক্ত বা সাধারণ তরলগুলি বাদ দিয়ে একটি cryoprotectant (“antifreeze”-এর মতো) সিরাম দেয়া হয়, যাতে কোষ ক্ষয়ের যা প্রধান কারণ সেই বরফের স্ফটিক গঠন নমনীয় কোষগুলোতে সর্বনিম্ন থাকে। সেই cryoprotectant-প্রক্রিয়া এবং দ্রুত শীতলকরণ (vitrification) এই দুটি ক্রায়োনিক্সের মূল প্রযুক্তি।
যদিও বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেন যে পুনর্জীবনের প্রযুক্তি এখনও অস্তিত্বে নেই এবং আজ পর্যন্ত কোনো জমাট দেহকে জীবিত করে তোলার প্রমাণ নেই, তবু পুনর্জীবিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং অনেক বিজ্ঞানী একে প্যারাসায়েন্টিফিক বা ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে দেখেন।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ ক্রায়োনিক সংরক্ষণে জমাট অবস্থায় রাখা আছে যদিও অনেক আন্তর্জাতিক সূত্রে সংখ্যাটি ৫০০–৭০০ জন বলা হয়।
অতি-নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষিত, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি তাদের পুনর্জীবিত করবে এই আশায় মৃত্যুর ঠিক পরেই তারা নিজেদের দেহ বা অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মস্তিষ্ক, তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এই বিশ্বাসে যে একদিন বিজ্ঞান এতটাই উন্নত হবে যে তাদের কোষ মেরামত করে প্রাণ সঞ্চালনের মাধ্যমে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারবে।
আক্ষরিক অর্থেই আজ এই শিল্প যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রাশিয়া, চীন এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে, যেমন Alcor Life Extension Foundation (১৯৭২), Cryonics Institute (১৯৭৬) ছাড়াও রাশিয়ার KrioRus, জার্মানির Tomorrow Biostasis এবং চীনের Yinfeng-এর মতো সংস্থাগুলো এখন শতাধিক দেহ ও মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করছে।
যেটা একসময় নিছক বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী মনে হতো, তা আজ বাস্তব এবং দ্রুত বিস্তৃত একটি শিল্পে পরিণত হচ্ছে।জার্মানির একটি সংস্থা এখন ২ লক্ষ ডলারের বিনিময়ে এইভাবে দেহ সংরক্ষণের অফার দিচ্ছে, যদিও সংস্থাভেদে খরচ পরিবর্তিত হয়।
পৃথিবীতে প্রয়োগিক বিজ্ঞানে সবচাইতে বেশি অর্থ খরচ করা হয় অমরত্ব আবিষ্কারের পিছনে। আমেরিকার এক সংস্থা মৃতদেহের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করার জন্য গবেষণা চালাচ্ছেন। ক্রায়োনিক পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের মৃতদেহ, মাথার খুলি তরল নাইট্রোজেনের মধ্যে রেখে সংরক্ষণ করে আসছে তারা।
১৯৭২ সালে আমেরিকার অ্যারিজোনা এলাকায় এই সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, এটিই সেই Alcor Life Extension Foundation যারা ক্রায়োনিক পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের মৃতদেহ তরল নাইট্রোজেনের মধ্যে রেখে সংরক্ষণ করে আসছে বহুবছর ধরে।
গোড়ার দিকে পশুপাখির উপর এই পরীক্ষা করলেও পরবর্তী কালে মৃত মানুষের উপরেও গবেষণা করতে শুরু করে এই সংস্থা। কোনও ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সংস্থার গবেষণার কাজে সাহায্য করতে চাইলে তিনিএকটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। কেউ কেউ আবার এই সংস্থার জন্য কিছু টাকাও বিনিয়োগ করে রাখেন।
যাঁরা এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন, তাঁরা শেষ বয়সে চিকিৎসাজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় নির্দেশ দিয়ে রাখেন। চিকিৎসকরা যে মুহূর্তে বুঝতে পারবেন যে, আর বাঁচার কোনও আশা নেই, তখন যেন সংস্থাকে খবর পাঠানো হয়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার কর্মীরা মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে যান নির্দিষ্ট হাসপাতালে। মৃত্যুর ঠিক পরেই তাঁরা ক্ষণিকের জন্য কৃত্রিম ভাবে হৃৎপিণ্ড সচল রাখার ব্যবস্থা করে। তার পর মৃতদেহটিকে বরফঠান্ডা জলে পরিষ্কার করা হয়। সেই অবস্থায় যত দ্রুত মৃতদেহটিকে গবেষণাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
শরীর থেকে সমস্ত রক্ত ও জলীয় পদার্থ বের করে একটি কম্পাউন্ড সিরাম দেহে প্রবেশ করানো হয়, যা cryoprotectant হিসেবে কাজ করে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে সংরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। এই মিশ্র রাসায়নিক কোষে বরফের স্ফটিক গঠন কমিয়ে দেয়। তারপর মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার হ্যাপি ক্যাপসুলে মৃতদেহটি ঢুকিয়ে রাখা হয়। মাঝেমধ্যে লিকুইড নাইট্রোজেনও প্রয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে vitrification বা controlled freezing বলা হয়।
এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, গবেষক এবং কর্মীদের ধারণা, চিকিৎসাবিদ্যা কয়েক বছরের মধ্যে এত উন্নত হবে যে তাঁরা এই মৃতদেহগুলির মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে সফল হবেন। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত একটি সম্ভব হয়নি, মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম স্নায়বিক সংযোগ (synapses) ও স্মৃতি কতটা অক্ষত থাকে তাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে ভবিষ্যতে synaptic connectivity হয়তো সংরক্ষিত মস্তিষ্কের তথ্য টিকে থাকার একটি সূচক হতে পারে, কিন্তু revival আদৌ সম্ভব হবে কিনা তা এখনও সম্পূর্ণ অজানা। তবুও এই ধারণায় বিশ্বাসীরা মনে করেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞান একদিন হয়তো তাদের রোগ সারিয়ে, কোষ মেরামত করে এবং স্মৃতি ফিরিয়ে এনে আবার তাদের জীবিত করে তুলবে।