ইনফ্লাইট সার্ভিস: স্বপ্নের উড়ান
আকাশের দিকে তাকালে এখনও মানুষের চোখে এক ধরনের শিশুসুলভ বিস্ময় দেখা যায়। এখনো বিমানের গর্জন শুনে উৎসুক মানুষ হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
পাখির মতো উড়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সভ্যতার শৈশব থেকেই মানুষের কল্পনায় বাস করেছে। সেই আকাঙ্ক্ষার প্রথম বাস্তব রূপ পেয়েছিল ১৯০৩ সালে, রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের উড়ানে। তারপর এক শতাব্দীর বেশি সময়ে উড়ান আর অলৌকিক ঘটনা নয়, তা আজ একটি নিয়ন্ত্রিত, প্রযুক্তিনির্ভর, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
আজকের বিমানযাত্রা আসলে এক বিশাল সমন্বিত ব্যবস্থার ফল। এয়ারপোর্ট অথরিটি , এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল), ওসিসি (অপারেশন কম্যান্ড সেন্টার), আবহাওয়া দপ্তর, নিরাপত্তা বাহিনী, ইঞ্জিনিয়ার, গ্রাউন্ড স্টাফ ইত্যাদি অসংখ্য অদৃশ্য হাত একসঙ্গে কাজ করে একটি ফ্লাইটকে আকাশে ওড়াতে। এই ব্যবস্থার মাঝখানে থেকেও একটি জগৎ আছে, যেটা যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি দেখেন, অথচ সবচেয়ে কম বোঝেন - ইনফ্লাইট সার্ভিস।
ঝকঝকে ইউনিফর্ম, ভদ্র হাসি, নির্ভুল ভঙ্গি, বিমানের ভেতরের এই দৃশ্যটাই বহু তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। আজকের যুবসমাজের কাছে ইনফ্লাইট সার্ভিস মানে শুধু একটি চাকরি নয়, বরং এক ধরনের জীবনধারা। আকাশে কাজের স্বপ্ন, ইউনিফর্মের গ্ল্যামার, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশে কাজ করার রোমাঞ্চ -সব মিলিয়ে এটি বাইরে থেকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
কিন্তু এই ছবির আরেকটি দিকও আছে। প্রায় দুই দশক ধরে বিমান পরিষেবার সঙ্গে আমার যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতা বলছে, ইনফ্লাইট সার্ভিস মূলত দায়িত্বের পেশা।
মাঝ আকাশে হঠাৎ অসুস্থ যাত্রী, খারাপ আবহাওয়া, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কেউ, এই সব পরিস্থিতিতে ক্যাবিন ক্রুদের প্রতিক্রিয়াই ভরসা। কয়েকশো মানুষের নিরাপত্তা তখন নির্ভর করে তাদের প্রশিক্ষণ, ঠান্ডা মাথা আর দলগত সিদ্ধান্তের উপর। এই দিকটি বিজ্ঞাপনে খুব কমই ধরা পড়ে।
এয়ারলাইনস ইন্ডাস্ট্রির আরেকটি বাস্তবতা হল ইনফ্লাইট সার্ভিসে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে চোখে পড়ার মতো কম। অধিকাংশ ভারতীয় এয়ারলাইন্স এখনও মূলত মহিলা ক্যাবিন ক্রুকেই অগ্রাধিকার দেয়। যদিও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অনেক এয়ারলাইন্সে লিঙ্গভিত্তিক এই বৈষম্য অনেকটাই কম।
দেশে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে গত কয়েক বছরে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য এয়ার হোস্টেস ও ক্যাবিন ক্রু ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। “নিশ্চিত চাকরি”, “বিদেশে পোস্টিং”, “গ্ল্যামারাস ক্যারিয়ার” -এই শব্দগুলির মোহে বহু তরুণ-তরুণী লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে।
ইনফ্লাইট সার্ভিসে ট্রেনিং ইনস্টিটিউটই কি একমাত্র রাস্তা? এই সার্ভিসে ট্রেনিংসার্টিফিকেট কি বাধ্যতামূলক ?লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করার আগে এই সত্যটা জানা অত্যন্ত জরুরি।
সোজা স্পষ্ট উত্তর হল- 'না'। ভারতের কোনও এয়ারলাইনসই বেসরকারি এয়ার হোস্টেস ইনস্টিটিউটের সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক নয়।
বাস্তব সত্যটা হল, আসল প্রশিক্ষণ শুরু হয় নিয়োগ পাওয়ার পরে। প্রতিটি এয়ারলাইনস নিজস্ব নিয়ম, আন্তর্জাতিক সেফটি প্রোটোকল ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দীর্ঘ ও কঠোর প্রশিক্ষণ দেয়।

তাহলে কিভাবে এয়ারলাইনসগুলি এয়ার-হোস্টেস বা কেবিন-ক্রু রিক্রুট করে ? ইনফ্লাইট সার্ভিসের জন্য কিভাবে আবেদন করা যেতে পারে ?
এয়ারলাইনসগুলি সাধারণত তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বা ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়ায় ওপেন ডে ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ -এর বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকে।
ন্যূনতম উচ্চ মাধ্যমিক (10+2) পাশ, ইংরেজিতে সাবলীলতা, পরিষ্কার উচ্চারণ ও শালীন ব্যবহার, নির্দিষ্ট উচ্চতা ও ফিটনেস এবং মেডিক্যালি ফিট হলেই যে কেউ আবেদন করতে পারে ইনফ্লাইট সার্ভিস পদগুলির জন্য।
এই ওয়াক-ইন ইন্টারভিউতে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির উপর এয়ারলাইনসগুলি প্রধানত নজর রাখে সেগুলি হল প্রার্থীর পেশাদার যোগাযোগ দক্ষতা, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, যাত্রীদের প্রতি সহানুভূতি, দলগত আচরণ এবং নিরাপত্তা সচেতনতা।
এয়ারলাইনসগুলি নিয়োগের পর শুরু করে কঠোর এবং আপসহীন ট্রেনিং। আগুন নেভানো, ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং ড্রিল, ইভাকুয়েশন, ফার্স্ট এইড ও CPR, বিমানের দরজা স্লাইড, অক্সিজেন সিস্টেম, আপদকালীন পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইন সম্পর্কে পড়াশোনা -এই প্রশিক্ষণের আসল পর্ব।
ইন্টারভিউ এ সফল হতে গেলে কোন সাধারণ কমিউনিকেশন স্কিল ডেভলপমেন্ট কোর্স বা গ্রুমিং এর কোর্স করা যেতে পারে যার কোর্স ফি অতিসামান্য। কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে "১০০% প্লেসমেন্ট" "প্লেসমেন্ট গ্যারান্টেড" জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেট নেবার যে কোন যৌক্তিকতা যে নেই দীর্ঘ ১৫ বছর এয়ারলাইন্স গুলির সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি।
এই পেশায় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি আসলে ভিন্ন জায়গায়। সঠিক তথ্য, বাস্তব প্রস্তুতি এবং মানসিক দৃঢ়তা। দীর্ঘ ওয়ার্কিং আওয়ার, অনিয়মিত জীবন, পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিদিন দায়িত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াটা একজন সফল কেবিন ক্রুর বাস্তব জীবন।
আকাশ আজ আর অচেনা নয়। কিন্তু আকাশে কাজ করাটা এখনও সহজ নয়। নীল গগনের ডাক অনেকেই শোনে, খুব কম মানুষই তার ভার বইতে পারে। যারা পারে, তাদের কাছে স্বপ্নের থেকেও বড় হয়ে ওঠে দায়িত্ব, শৃঙ্খলা আর মানুষের ওপর মানুষের নির্ভরতার মূল্য।