ফিচার
বইয়ের ঘর
ভূমধ্য সাগরের তীরে ঝলমলে এক জ্ঞানের নগরী আলেকজান্দ্রিয়া। ইতিহাসে পৃথিবীর প্রথম ইউনিভার্সাল লাইব্রেরী হিসেবে মিশরের "লাইব্রেরী অফ আলেকজান্দ্রিয়া"র কথাই উঠে আসে।
যেকোন জাহাজ আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে ঢুকলেই প্রথমে কেড়ে নেওয়া হতো সেই জাহাজে থাকা সমস্ত বই। তারপর বইগুলি কপি করা হয়ে গেলে আসল বইটি রেখে কপিটি ফেরত দেওয়া হতো তার মালিককে। এভাবেই ধীরে ধীরে লাইব্রেরী অফ আলেকজান্দ্রিয়ায় সংগ্রহে এসেছিল প্রায় ৪ থেকে ১০ লক্ষ 'স্ক্রল'। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গণিত, চিকিৎসা জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, নাটক ইত্যাদি বিষয়ে 'লাইব্রেরিয়া আলেকজান্দ্রিয়া' হয়ে উঠেছিলগ্রীক, মিশরীয়, ও ভারতীয় জ্ঞানের ভান্ডার। জ্ঞানপিপাসুদের পীঠস্থান।
তবে পৃথিবীর প্রথম লাইব্রেরীটি নির্মিত হয় ৬৬৮ থেকে ৬৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। অ্যাসিরীয় রাজা আশুরবাণীপাল এর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি। কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা ৩০,০০০-এরও বেশি মাটির ফলক নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই লাইব্রেরি। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে মেসোপটেমিয়া-টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের মাঝখানে নিনেভেহ নগরীতে তিনি এই লাইব্রেরী গড়ে তোলেন।
আজকের আধুনিক লাইব্রেরীর ক্যাটলগ ও বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নকল কপি সংরক্ষণের ব্যবস্থা তিনিই প্রথম চালু করেন।
প্রশাসনিক নথি এবং ধর্মীয় ও বিভিন্ন বাস্তব জ্ঞান সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা থেকে লাইব্রেরীর ধারণাটি আসে। পরে ল্যাটিন 'liber' অর্থাৎ গাছের ছাল বা পাতলা কাঠের উপর লেখা বই -থেকে 'লাইব্রেরী' শব্দটি এসেছে। ফরাসি 'Librairie' যার অর্থ 'বইয়ের ঘর' থেকে আজকের ইংরেজি 'Library' চল।

একসময় ভারতীয় উপমহাদেশে বৈদিক যুগে মৌখিকভাবে ধর্মীয় অন্যান্য জ্ঞান সংরক্ষণ করা হত। কিন্তু ভারতবর্ষের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক লাইব্রেরী ছিল নালন্দা বৌদ্ধ বিহারের ধর্মগঞ্জ লাইব্রেরী। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে এই লাইব্রেরী নির্মিত হয়। চীনা পর্যটক ও পরবর্তী ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে জানা যায় প্রায় ৯০ লক্ষ পান্ডুলিপির সংগ্রহ ছিল এই লাইব্রেরীতে।
বাংলার প্রথম লাইব্রেরী হিসেবে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরী' । যা আজকের ন্যাশনাল লাইব্রেরী নামে বিখ্যাত। স্বাধীনতার পর 'কলকাতা লাইব্রেরি'র নাম বদলে 'ন্যাশনাল লাইব্রেরি' রাখা হয়।
প্রায় ৩২০০ পান্ডুলিপি, ৮৬ হাজার মানচিত্র, অগণিত সংবাদপত্র, প্রাদেশিক ও বিদেশী বই মিলিয়ে মোট প্রায় ২৫ থেকে ৪০ লক্ষ বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে এখানে। ভারতবর্ষের সবচাইতে বৃহৎ লাইব্রেরী হল কলকাতার এই ন্যাশনাল লাইব্রেরী।
'গ্রন্থ' বা লিখিত জ্ঞান, 'আগর' বা ঘর - সংস্কৃত এই দুটি সংস্কৃত শব্দ নিয়ে বাংলায় গ্রন্থাগারের সূচনা। বাংলার সংস্কৃতিতে লাইব্রেরী বা গ্রন্থাগার বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। একসময় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির লাইব্রেরী বাঙালির জ্ঞান, রুচি ও মননীলতা সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে। আর সেই তাগিদেই শহরে, মফস্বলে, বিভিন্ন ক্লাবে শিক্ষামোদী, জ্ঞানপিপাসু মানুষদের উদ্যোগে একসময় প্রচুর গ্রন্থাগার তৈরি হয়েছে।
বাংলার “বইপড়া সংস্কৃতি” গড়ে ওঠার পিছনে মূলত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক লাইব্রেরীগুলির যৌথ ভূমিকা রয়েছে। এই চর্চা একসময় বাঙালিকে নিছক কৌতূহলী পাঠক থেকে গবেষক করে তুলেছিল।
একটা সময় ছিল যখন বাঙালির কাছে বই পড়াটা ছিল একটা 'সুযোগ' । মা-বাবা-কাকার চোখ এড়িয়ে পাঠ্য বইয়ের ভেতর লুকিয়ে কমিক্স বা গল্পের বই পড়াটা আমাদের অনেকেরই কম বেশি স্মৃতি। বই পড়ার জন্য গরমের বা পুজোর ছুটির অপেক্ষা করাটা তখন ছিল এক ধরনের প্যাশন। লাইব্রেরী থেকে বই তুলে গোগ্রাসে গিলে আবার পরের বইটি তোলা -সে এক মজাদার সময়।
জীবন এখন অনেক জটিল। ইন্টারনেট আর সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের একছত্র আধিপত্যের তলায় চাপা পড়ে গেছে সেই সোনালী শৈশব। পড়ার চেয়ে দেখাটাই এখন মুখ্য।
অবশ্য আজকের ইন্টারনেটের যুগে লক্ষ লক্ষ বই, পত্র-পত্রিকা, অডিও ভিজুয়াল সংগ্রহ নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রচুর ভার্চুয়াল লাইব্রেরী। তৈরি হয়েছে 'ইন্টারনেট আর্কাইভ' বা 'প্রজেক্ট গুটেনবার্গ' এর মত ওপেন সোর্স প্লাটফর্ম। গঠিত হয়েছে ইউনেস্কোর 'ওয়ার্ল্ড ডিজিটাল লাইব্রেরি' বা ভারতবর্ষের 'ন্যাশনাল ডিজিটাল লাইব্রেরী অফ ইন্ডিয়া' এর মত অনলাইন সংস্করণ।
প্রাচীনকাল থেকে লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার শব্দটি আমাদের স্মৃতিতে যে অনুভূতি নিয়ে আসে অনলাইন লাইব্রেরী বা আর্কাইভ এখন পর্যন্ত তার সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি।
হয়তো সে কারণেই এখনও কিছু লাইব্রেরি টিকে আছে। তবে আগামীতে সরকারি আনুকূল্য ও বইপ্রেমীদের সামগ্রিক চেষ্টা ছাড়া লাইব্রেরিগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। হয়তো একদিন স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে লাইব্রেরীর শব্দ গন্ধ ভালোবাসা গুলি।