রাজনীতি

ভারতভাগের নীল নকশা

মনীশ রায়চৌধুরী
মনীশ রায়চৌধুরী 08 Mar, 2026
১৬
৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত লড়াই দেখেই ইংরেজ বুঝেছিল এই দেশকে দখল করতে গেলে হিন্দু মুসলিমকে আলাদা করতেই হবে। জনগণ যাতে শাসকের বিরুদ্ধে একজোট হতে না পারে তাই তাদের জাতি, ধর্মের নামে বিভাজিত করার কৌশল শুরু হল।
 
    তখন থেকেই তারা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি নানাভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করে।
 
    উগ্র হিন্দুত্ববাদী এবং মুসলিম সংগঠন যেমন হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, মুসলিম লীগের নেতারা তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করে যাতে পারস্পরিক ঘৃণার পরিবেশ ক্রমশ বাড়তে থাকে। তৎকালীন সরকারি রিপোর্ট এবং ঐতিহাসিক গবেষণায় এরকমই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে।
 
    আজ আমরা এরকমই কিছু তথ্য নিয়ে আলোচনা করব। বর্তমান ভারতে যেভাবে দেশে উগ্র ধর্মীয় মেরুকরণের পরিবেশ তৈরি হয়েছে তার সাথে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাবেন। আসলে  modus operandi তো এরা এদের তৎকালীন প্রভু ইংরেজদের থেকেই কপি করেছে।
 
    বর্তমানে যেমন গোরক্ষক দল আছে, তখনও ছিল। এখনো যেমন হিন্দু উৎসবে মসজিদের পাশে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্বেষমূলক স্লোগান দিয়ে লম্ফঝম্প করাকে চাড্ডিগণ পরম কর্তব্য মনে করে, তাদের পূর্বপুরুষরাও তাই করত। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে, বিশেষত Cow Protection Movement (গোরক্ষা আন্দোলন) এবং Music Before Mosque বিতর্কের সময় হিন্দু-মুসলমান সংঘাতকে পদ্ধতিগতভাবে উস্কানো হয়।
 
    ১৮৮০-১৮৯৩ সালের মধ্যে উত্তর ভারতে “Gau Rakshini Sabhas” (গোরক্ষা সভা) গঠিত হয়,  যা প্রথমে ধর্মীয়, পরে রাজনৈতিক চরিত্র নেয়। মুসলমান কসাইদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়া হয়।
 
    দিল্লি, বেনারস, গোরখপুর, শাহজাহানপুর, আজমের, এবং বিহারের কিছু অঞ্চল — এসব জায়গায় হিন্দু-মুসলমান দা*ঙ্গার মূল কারণ হিসেবে “গরু হত্যা” বা “গরুর মাংস মন্দিরে নিক্ষেপ” ধরা হয়। মুসলমানদের কাছে শূকর “অপবিত্র” হওয়ায়, কিছু জায়গায় দাঙ্গার সময়ে শূকর বা শূকরের মাংস মসজিদের সামনে ফেলা হতো।
 
    সরকারি রিপোর্টে দেখা যায়, উভয় সম্প্রদায়ের উগ্র ধর্মান্ধরাই একে অপরকে উস্কাতে এই ধরনের অপমানজনক কাজ করত।
 
    Government of United Provinces, Report of the Kanpur (Cawnpore) Ri*ots Enquiry Committee, 1931 রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা আছে, “In several localities, animal remains were deliberately placed in places of worship to provoke the opposite community. Evidence shows that some miscreants belonging to both sides took part in such acts to infla*me comm*unal passions.”
 
    Government of India, Report on the Rio*ts at Benares and Gorakhpur, 1893, Home Department Proceedings, File No. 199–A রিপোর্ট অনুযায়ী, “The outbreak seems to have been engineered by vested interests on both sides. Cow heads were found in temple premises, and pieces of pig flesh in mosques. Subsequent investigation revealed that such acts were committed not by devout members, but by hooligans hired for the purpose.”
 
    "Bengal Legislative Council, Report on the Calcutta Disturbances, 1926, Government of Bengal, 1927 রিপোর্ট অনুযায়ী, “A number of provocative incidents were recorded, including defilement of sacred places by both Hindu and Muslim miscreants, often under direction of local political clubs seeking to display their strength.”
 
    শাহজাহানপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট Sir John Maynard স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে লেখেন, এইসব দা*ঙ্গা কোন স্বতস্ফুর্ত ধর্মীয় আবেগ থেকে হতনা, এগুলো দুই ধর্মের দুষ্কৃতিদের দ্বারাই ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হত।
thescroll.in
    “The rio*ts were not spontaneous. Mischievous elements on both sides desecrated their own symbols to infla*me others.”- (Home Political Department Correspondence, 1894, File No. 24/94-P)
 
    আবার Government of Punjab, Report on the Hindu-Muslim Ri*ots of 1927, Lahore, 1928 রিপোর্টে আছে, “Several witnesses testified that portions of pig were thrown near mosques, and cow flesh near temples, apparently by elements seeking to infla*me both sides.”
 
    “The local administration suspects deliberate attempts by politically motivated groups to create religious disorder before the provincial elections.”
 
    W.W. Hunter ১৮৭৬ সালে লেখেন, “The policy of infla*ming religious passions for political advantage was well understood by certain sections during the late 19th century.”
 
    অর্থাৎ তখনও ভোটের আগে ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করতে একইরকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলত।শুধু শুভেন্দু বাবু বা সিদ্দিকুল্লাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই রোগ তাদের বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
 
    ভোট এলেই গোরক্ষকরা সাধারণ মুসলিমদের পেটাবে নাহলে মসজিদের সামনে বাঁদর নাচ দেখাবে, সেটা দেখিয়ে মোল্লারা 'ইসলাম আক্রান্ত' বলে মুসলমানদের ক্ষেপাবে, আবার সেই সুযোগে 'হিন্দু খতরেমে হ্যায়' বলে বাছুরগুলো হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণের নোংরা রাজনীতি করবে এই স্ট্র‍্যাটেজি তখন থেকেই চলে আসছে।
 
    India Office Records, Home Dept., Public & Judicial, Proceedings No. 84, 27 Dec 1893 রিপোর্টে বলা হয়েছে, “A considerable number of disturbances arose out of the practice of Hindu processions playing music in front of mosques. In several towns, the refusal of the Muslim community to tolerate such practices led to violent encounters.”
 
    ঐ রিপোর্টে আরও পাওয়া যায়, “a crowd of Hindus armed with lathis … attacked the butchers taking cattle for the commissariat at Dinapore"
 
    ঐতিহাসিক Sandria Freitag তার 'Collective Action and Community' বইতে লিখেছেন হিন্দু গোরক্ষকদের এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনগুলিও ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠে, “In response to processions and cow-protection campaigns, Muslim organizations such as the Anjuman-i-Islam and Jamiat-ul-Islam began to mobilize around the slogan of defending Islam from interference. Thus, both sides became locked in competitive religious assertion, inadvertently serving the colonial aim of comm*unal segmentation.”
 
    অর্থাৎ পারস্পরিক ঘৃণার চর্চা এভাবেই ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু, এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা কী ছিল? দেশের শাসক হিসেবে এইসব ঘটনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায় তাদের উপরই বর্তায়। তারাই তো তখন ভারতীয়দের দন্ডমুন্ডের কর্তা।
 
    কিন্তু সরকারি রিপোর্ট এবং ঐতিহাসিকদের বিবরণ অনুযায়ী তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দা*ঙ্গাবাজদের প্রতি তাদের নীরব সমর্থন আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করেছে।
 
    India Office Records, Public & Judicial Dept., Home Department Proceedings No. 84, 27 December 1893 (PP 1893–94, Vol. 63, Paper 538) অনুসারে, “The local authorities failed to take prompt measures to prevent the disturbances. At several places, the hesitancy of the magistrates and police in dispersing early gatherings contributed to the spread of violen*ce.”
 
    জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে The Construction of Communalism in Colonial North India (Oxford University Press, 1990) বইতে লিখেছেন, “In several recorded instances, the British magistrates either remained passive or acted late in the day. Their studied neutrality - part of the colonial administrative ethos - often meant that rumours and street-processions were allowed to build up before any intervention occurred.” (p. 148)
 
    মুশিরুল হাসান Nationalism and Commu*nal Politics in India, 1885–1930 (Manohar Publishers, 1991) বইতে এই অস্থির সময়ের বর্ণনা করেছেন, “The district officials were hesitant to interfere with religious processions, fearing allegations of bias. This administrative indecision frequently turned local tensions into full-scale rio*ts.” (pp. 212–213)
 
    Sandria Freitag এর বইতেও প্রশাসনিক গাফিলতির একই বর্ণনা পাওয়া যায়, “The British officials, while claiming neutrality, often allowed rival religious processions to pass through sensitive localities. The administration’s refusal to restrict provocative demonstrations in Benaras (1893) and Shahjahanpur (1893) virtually guaranteed outbreaks.” (pp. 115–116)
 
    কোন ঘটনা প্রসঙ্গে সবার বর্ণনা যদি মোটামুটি একইরকম হয় তখন তাকে সত্য বলেই ধরে নিতে হয়। অতএব সত্য এটাই যে ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই ভারতে তাদের গদি সুরক্ষিত রাখতে হিন্দু ও মুসলমানদের দুটো বিবদমান গোষ্ঠীরূপে পারস্পরিক ঘৃণার পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করেছিল। এই পরিকল্পিত ঘৃণাই পরে দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্ম দেয় যা দেশভাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
 
    তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে দেশভাগের দায়ভার হিন্দু না মুসলমান কার উপর বর্তায়। আসলে এত জটিল একটা প্রশ্নের কখনোই একটা উত্তর হওয়া সম্ভবই নয়। তবুও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে কিছুটা আলোচনা করা যেতেই পারে।
 
    সত্য এটাই যে মুসলিম লিগ দ্বিজাতিতত্ত্ব ঘোষণা করে দেশভাগের প্রস্তাব উত্থাপনের বহু আগেই হিন্দুত্ববাদীরা এই ধারণার প্রস্তাবনা করেন।
 
    অরবিন্দ ঘোষের মাতামহ রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬-১৮৯৯) এবং নবগোপাল মিত্র (১৮৪০-১৮৯৪) কে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের প্রাণপুরুষ বলা যেতে পারে। তারা বর্ণপ্রথায় একান্ত বিশ্বাসী ছিলেন। হিন্দুজাতি একদিন জেগে উঠবে এবং খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের পরাজিত করে সমগ্র বিশ্বে হিন্দুধর্মের বিজয় পতাকা ওড়াবে এটা তারা স্বপ্ন দেখতেন। বিজেপি, আরএসএসের বহু পূর্বে এমনকি তাদের মাতৃসংগঠন হিন্দু মহাসভারও আগে তারা 'সারা ভারত হিন্দু সমিতি' গড়ে তুলেছিলেন।
 
    নবগোপাল মিত্রর উদ্যোগে আয়োজিত বাৎসরিক হিন্দুমেলাতে নানা প্রকারে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের উৎকর্ষতার প্রচার করা হত। ১৮৬৭ থেকে ১৮৮০ পর্যন্ত নিয়মিত প্রতি বছর এই মেলা আয়োজিত হয়েছিল। নবগোপাল বলেছিলেন, "ভারতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ভিত্তি হচ্ছে হিন্দুধর্ম। হিন্দু জাতীয়তা ভারতের সকল স্থান ও ভাষা নিরপেক্ষভাবে ভারতের সমস্ত হিন্দুকেই জড়িয়ে আছে।"
 
    ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের খুব স্পষ্টভাবেই বুঝেছিলেন যে, "নবগোপাল মিত্র অর্ধশতক আগেই জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্বের পুরোগামী ছিলেন।" এবং তখন থেকেই "সচেতন বা অবচেতন ভাবে জাতীয়তাবাদের উপর হিন্দু চরিত্রের ছাপ গভীর ভাবে দাগ কেটে বসে।"
 
    ভাই পরমানন্দ একদিকে ছিলেন আর্য সমাজের অন্যতম প্রচারক, আবার তিনি একইসাথে কংগ্রেস এবং হিন্দুমহাসভার অন্যতম নেতা ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার পরিবর্তে সারাজীবন প্রচুর মুসলিম বিরোধী লেখা লিখেছিলেন। তিনি তার প্রচার পত্রের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য যে একেবারেই অসম্ভব তাই প্রচার করে বেড়াতেন।
 
    তার একটি প্রচারপত্রে পাওয়া যায়, "ইতিহাসে হিন্দুগণ পৃথ্বীরাজ, প্রতাপ, শিবাজি এবং বেরাগী বীরের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা করে, যারা এই দেশের সম্মান ও স্বাধীনতার জন্য (মুসলমানের বিরুদ্ধে) সংগ্রাম করেছেন, আর মুসলমানেরা ভারত আক্রমণকারী মুহম্মদ বিন কাশেম এবং ঔরঙ্গজেবের মত শাসকদের জাতীয় বীর বলে মনে করেন।"
 
    ভাই পরমানন্দ তার উর্দুতে রচিত পুস্তিকা 'হামারে কওমি হিরো' তে লিখেছিলেন, "হিন্দু ও ইসলামের অনুগামীগণ দুটি পৃথক জনগোষ্ঠী। কারণ মুসলমানেরা যে ধর্ম অনুসরণ করেন তার জন্মস্থান আরবভূমি। তাই হিন্দুরা ভারতের প্রকৃত সন্তান আর মুসলমানেরা বহিরাগত।"
 
    জিন্নাহ তথা মুসলিম লিগের বহু আগে ১৯০৮-০৯ সালেই তিনি তার আত্মজীবনী 'দ্য স্টোরি অফ মাই লাইফ'-এ লেখেন, "সিন্ধুর ওপারের অঞ্চলটি আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে একটা বৃহৎ মুসলিম রাজ্য গড়ে তোলা উচিত। ঐ অঞ্চলের হিন্দুদের জায়গাটি ছেড়ে চলে আসতে হবে ও বাকি ভারতের মুসলমানদের ওখানে চলে যাওয়া উচিত হবে।"
 
    কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা এবং আর্য সমাজের অপর এক প্রখ্যাত নেতা লালা লাজপত রাই (১৮৬৫-১৯২৮) তারও পূর্বে ১৮৯৯ সালে হিন্দুস্থান রিভিউতে লেখেন, "হিন্দুদের মধ্যে একটি জাতি হয়ে ওঠার মতো সবকিছুই আছে, যে কারণে তারা একটি জাতি হয়ে উঠেছিল।"
 
    ১৯২৪ সালে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বর উপকারিতা ব্যখ্যা করে লেখেন, "আমার পরিকল্পনা মতো মুসলমানেরা চারটি মুসলিম রাজ্য পাবে; উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পাঠান প্রদেশ, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু প্রদেশ এবং পূর্ব বাংলা। যদি ভারতের অন্য কোন অঞ্চলে ঘন মুসলিম জনবসতি থাকে, তবে সেখানে একইভাবে রাজ্য গঠিত হওয়া উচিত। কিন্তু একথা পরিষ্কার বুঝতে হবে যে এখানে কোন সংযুক্ত ভারতের কথা বলা হচ্ছেনা। এর অর্থ ভারতকে পরিষ্কারভাবে মুসলিম ভারত ও অমুসলিম ভারতে ভাগ করতে হবে।"
 
    ১৯২৩ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকর তার হিন্দুত্ব বিষয়ক বইতে লেখেন, "খ্রিষ্টান ও মুসলিম সম্প্রদায় যারা কিছুকাল আগেও হিন্দু ছিল এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম পুরুষে এই নতুন গোত্রের সদস্য, সেক্ষেত্রে যদিও আমাদের মতো তাদেরও একই পিতৃভূমি ও শরীরে বিশুদ্ধ হিন্দু  রক্ত ও পিতৃ পরিচয় রয়েছে, তবু্ও তাদের হিন্দু বলে মেনে নেওয়া যায়না। কারণ নতুন ধর্মগ্রহণ তাদের হিন্দু সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা নিজেদের হিন্দু ভিন্ন সম্পূর্ণ পৃথক একটা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের অধিকারভূক্ত অথবা অঙ্গীভূত হিসাবে বিবেচনা বিবেচনা করে। তাদের বীরপুরুষ বা বীরপুরুষ স্তুতি, উৎসব, মেলা, তাদের ধ্যানধারণা ও জীবনের প্রতি দৃষ্টি এখন আমাদের থেকে আলাদা।"
 
    ১৯৩৭ সালে আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসভার ১৯তম সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন, "যেমনটি দেখতে পাই, আজও ভারতে দুটি দ্বন্দ্বমূলক জাতি পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। কতিপয় শিশুসুলভ রাজনীতিবিদ যে ভুলটি করেন তা হল, তারা ধরেই নেন যে ভারত ইতিমধ্যেই একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছে অথবা ইচ্ছানুসারে এভাবে গড়ে তোলা সম্ভব।...আজ আর ভারতকে সমসত্ত্বরূপে ভাবতে পারা যায়না। পরিবর্তে প্রধানত : দুটি জাতি হিন্দু ও মুসলমান ভারতে বর্তমান।"
 
    আরএসএসের অপর প্রাণপুরুষ এম.এস. গোলওয়ালকর ১৯৩৯ সালে তার বই We or Our nationhood Defined নাৎসি জার্মানি বা ফ্যাসিস্ট ইতালিতে ইহুদি তথা সংখ্যালঘুদের উদাহরণ তুলে মুসলমানদের হুঙ্কার দিয়ে বলেন যে স্বাধীন ভারতে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে হিন্দু জাতির অনুগত ভৃত্যের ন্যায় জীবনধারণ করতে হবে।
 
    স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জননেতারাও একইভাবে চাইতেন মুসলমানরা স্বাধীন ভারতে না থাকুক, আর যদি থাকতেই হয় তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুজাতির অনুকম্পার পাত্র হয়ে থাকুক। একহাতে তালি বাজে না।
 
    নিঃসন্দেহে বলা যায় এই ধরনের হিন্দু মৌলবাদী চিন্তা পরোক্ষে ইসলামিক মৌলবাদী গোষ্ঠীর সুবিধা করে দিয়েছিল। তারা সহজেই এদের উদাহরণ তুলে সাধারণ মুসলিম জনতার একটা অংশকে ভুল বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে ভারত কখনোই তাদের আপন দেশ হতে পারেনা, মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তান চাই-ই চাই।
 
    মহম্মদ আলি জিন্নাহ তার দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যাখ্যা করে লিখলেন, "হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি ও ভাষার অন্তর্গত। তারা যেমন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়না, তেমনি তারা একত্রে ভোজনও করেনা এবং বাস্তবিক এ-দুটি পৃথক সভ্যতা, যা মূলত পরস্পর বিরোধী শত্রুতামূলক ধ্যান-ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে। জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনযাত্রার ধরন পৃথক।
 
    এটা পরিস্কার যে ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন উপাদান থেকে তারা উৎসাহ ও উদ্দীপনা আহরণ করে। তাদের পৃথক মহাকাব্য, বীরত্বব্যঞ্জক চরিত্র এবং পৃথক দৃশ্যকাব্য রয়েছে।"
 
    ১৯৩৭ সালে আহমেদাবাদে হিন্দু মহাসভার ১৯তম অধিবেশনে সাভারকর হিন্দু এবং মুসলমানকে দুটো পৃথক জাতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে তাদের আলাদা রাষ্ট্র হওয়া উচিত বলে দাবি করে।
 
    ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে জিন্নাহ একইভাবে হিন্দু, মুসলিমকে আলাদা জাতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে স্বাধীন পাকিস্তানের দাবি করে।
 
    ১৯৪৩ সালে সাভারকর জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং স্বাধীন পাকিস্তানের দাবিকে সমর্থন করে বিবৃতি দেয়, "I have no quarrel with Mr Jinnah's two-nation theory. We Hindus are a nation by ourselves and it is a historical fact that Hindus and Muslims are two nations."
 
    মজার বিষয়, হিন্দু এবং মুসলমানকে দুটো আলাদা জাতি হিসেবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সাভারকর এবং জিন্নাহর বক্তব্য এমনকি উদাহরণে পর্যন্ত এমন আশ্চর্য সাদৃশ্য ছিল যে তাতে বিস্মিত হয়ে আম্বেদকর বলেছিলেন, "আশ্চর্যের বিষয়, দেখা যাচ্ছে যে মি. সাভারকর ও মি. জিন্নাহ একই জাতি ও দ্বিজাতি প্রসঙ্গে একে অপরের বিরোধী হওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ঐক্যমত ছিলেন। তারা দুজনেই স্বীকার করেন এবং শুধু স্বীকারই করেননা যে ভারতে দুটি জাতি-- এক হিন্দু ও দুই মুসলমান। শুধুমাত্র কী কী বিষয় ও শর্তে দুটি রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে, সে প্রসঙ্গে তাদের বিরোধ ছিল।" 
 
    আসলে দুই পক্ষের মৌলবাদীরাই যে দেশভাগের স্ক্রিপটটা একই প্রভু অর্থাৎ ইংরেজদের থেকে পেয়েছিল তাতে কোনপ্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। মৌলবাদীদের ফাঁদে পা দেওয়ার পরিণতি যে কী মর্মান্তিক হতে পারে দেশভাগ এবং লাখো মানুষের প্রাণঘাতি সাম্প্রদায়িক দা*ঙ্গা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। একটা সুগঠিত সমৃদ্ধ সমাজের পরিবর্তে আমরা পেলাম ক্ষয়িষ্ণু দুটি রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তান এবং আরও পরে পাকিস্তানেরও বিভাজন হয়ে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
 
    ক্ষমতাবানেরা রাষ্ট্রের গদি পেল। কিন্তু তাদের কথায় নেচে যে সাধারণ হিন্দু, মুসলিম জনতা নিজেদের ভিতর কাটাকাটি করে মরল তারা একটা বিরাট শূন্য ছাড়া আর কিছুই পেলনা।
 
সময় এগিয়েছে, কর্পোরেট প্রভুদের স্বার্থসিদ্ধি করতে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা আবার মানুষকে ধর্মের নামে লড়িয়ে দিতে চাইছে।
আমরা কি এখনো কিছুই শিখবনা ?
মনীশ রায়চৌধুরী

মনীশ রায়চৌধুরী

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।