ফিচার

সিনেমায় আসতে হলে

রোহান গামা মীর
রোহান গামা মীর 08 Mar, 2026
১৬
গ্ল্যামার, ক্যামেরার ঝলকানি, ঝাঁ চকচকে সেট, তারকাদের মেলা, সংবাদপত্রের ক্লাসি পেজ থ্রি, ভরপুর বিনোদন,  সব মিলিয়ে স্বপ্নের এক মোহময় হাতছানি  সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। 
 
    এমন গ্ল্যামার দুনিয়ার রুপোলি পর্দায় নিজেকে বেঁধে ফেলতে চায় এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। চোখে মুখে  এক রাশ স্বপ্ন, নিজেকে বড়ো পর্দায় দেখানোর এক মায়াবী কল্পনা, আর সেই মায়াজালে পড়ে অগ্নিপতঙ্গের মত তারা গ্রাম -গঞ্জ, আধা শহর-মফস্বল থেকে ছুটে আসে টলিউডে। রাতারাতি তারকা হতে চাওয়া, আচমকা সেলিব্রিটি হতে চাওয়া সেই তরুণ তরুণীরা নিজের অজান্তেই  পা দিয়ে ফেলে এক অদৃশ্য ফাঁদে।
 
    শত শত তথাকথিত চিট ফিল্ম সংস্থা সেই সব তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন  নিয়ে খেলা শুরু করে দেয় মুহূর্ত্তেই । পস এলাকায় ঝাঁ-চকচকে অফিসে অডিশনের নামে চলে ম্যানিপুলেশন আর ব্রেন ম্যাপিং। টিভি বা সিনেমার কিছু অল্প খ্যাত শিল্পীদের  সামনে রেখে, আপাত বাস্তব অথচ মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সেই স্বপ্নের ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকা তরুণ তরুণীদের দের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ একপ্রকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আর সুন্দরী তন্বী তরুণী দের  কাজ দেয়ার নামে চলে যৌন শোষণ।
 
    সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ীর অভিভাবকেরা কখনোই চায়না তাদের সন্তান আলো খুঁজতে গিয়ে অন্ধকারে মিশে যাক।  নিশ্চিত ভবিষ্যৎ বলে এ পেশায় আসলে যে কিছু নেই সে সম্পর্কে মধ্যবিত্ত মানুষের একটি আবছায়া ধারণা আছে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা সত্যি হিসেবে প্রমাণিত। 
 
    তাহলে কি সিনেমার জগত মানেই অপ্রাপ্তি আর দীর্ঘশ্বাস? না, ব্যাপারটা সেরকমও নয়।  অন্যান্য সব সেক্টরের মত ভীষণ প্রতিযোগিতার মধ্যেই এখানেও সফল অনেকেই। কিন্তু মূলত যাদের বেড়ে উঠা কলকাতা কেন্দ্রিক, ভীষণ অধ্যাবসায়ে যারা নিজেদের তৈরী করছে দিনের পর দিন, অভিনয়টা শিখেছে পদ্ধতিগতভাবে এবং নাটক-থিয়েটারে দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে হাত পাকিয়েছে, আর নিজেকে গ্ৰুমিং করছে কঠোর পরিশ্রমে তারাই জয়ী হয়েছে এই প্রতিযোগিতায়।
thescroll.in
    সিনেমা সম্পর্কে প্রচুর পড়াশোনা, প্রয়োজনীয় কমিউনিকেশন স্কিল, সিনেমা জগতের ধারাবাহিক বাস্তবিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছে এই পথে।
 
    ইন্ডাস্ট্রির পরিবারতান্ত্রিকতাও নতুন ছেলে মেয়েদের এ জগতে প্রবেশের আর এক অন্তরায়। চলচ্চিত্রে দুম করে অভিনয়ে চান্স পেয়ে যাওয়া অধিকাংশেরই  বাবা, মা, কাকা, মামা কোন না কোনভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবে এটাই বাস্তব। এছাড়াও মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক এই ইন্ডাস্ট্রির বাইরের বৃহত্তর বাঙলার গ্রাম ও মফস্বলগুলির ছেলে-মেয়ে দের সঙ্গে প্রাথমিক সাক্ষাতে ডিরেক্টর, প্রোডিউসার দের একটা নাক শিটকানো ব্যাপার থাকেই তা সে যতই প্রতিভাবান হোক না কেন। 
 
    প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও গ্রামের সেই ছেলে বা মেয়েটির কলকাতায় থাকার জায়গার অভাব, অর্থের অভাব, তার উপর পারিবারিক অসমর্থন খুব দ্রুত স্বপ্নগুলিকে গুঁড়িয়ে দেয়। টিকে থাকতে গেলে যে কোন উপায় টাকা ইনকাম, গ্রামে ফিরে গেলে লোক লজ্জার ভয়, টিটকারি। সব মিলিয়ে এক প্রকার দিশাহীন হয়ে পড়ে স্বপ্নবিভোর চোখগুলি। স্বপ্নভঙ্গের ক্লান্তি ফুটে ওঠে চোখের কালিতে। 
 
    বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে  সমস্যা গুলি একেবারে চরম মাত্রার। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে, নিজেদের রূপ-গ্ল্যামার ধরে রাখতে, প্রয়োজনীয় পোশাক কিনতে, নিজেদের কে আপাদমস্তক 'শহুরে'  করে তুলতে, তাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে অস্বাভাবিক অংকের টাকার।  আর এই সুযোগ বা দুর্যোগেই জন্ম নেয় ছায়ার মত আর এক জগত। পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি। 
 
    স্ট্রাগলিং উঠতি অভিনেত্রীদের প্রোডিউসার, পরিচালক বা শিল্পপতিদের কু নজরে পড়াটা সর্বজনবিদিত। ঝাঁ-চকচকে গাড়ী, বিলাসবহুল ফাইভ ষ্টার হোটেল, বাদশাহী খানা-পিনা, এলাহী জীবন যাত্রা তাদের মাথা ঘুরিয়ে দেয় পলকে। অর্থ কিছু আসে বটে  কিন্তু বুঝতেও পারে না আস্তে আস্তে  তাদের স্বপ্ন থেকে কত শত যোজন দূরে সরে গেছে তারা।
 
    এদের কেউ কেউ স্থায়ীভাবে থেকে যায় শুধুমাত্র রাতের রজনীগন্ধা হয়ে, কেউ কেউ হারিয়ে যায় সফট পর্ণের আধো আবছায়ায়, কেউ বা চূড়ান্ত হতাশায় নিজেদের শেষ করে দেয়। বিরাট স্বপ্নের ইন্ডাস্ট্রিতে ছোট ছোট স্বপ্নগুলির অপমৃত্যু ঘটে। 
 
    আজকের মোবাইল রীলস অবশ্য মানুষকে সাময়িক সস্তা জনপ্রিয়তা ও অনিয়মিত ইনকাম দিচ্ছে এটা বাস্তব, কিন্তু ঠিক কিসের বিনিময়ে ? রিলের জগতে ১৮ থেকে ৫৮ সবার এখন বুকের আঁচল খোলা। নগণ্য দুই একটি অভিনয় ও শিল্প সংক্রান্ত পেজ বাদ দিলে বাকি সবটাতেই রান্না শেখানোর নামে, প্রাত্যহিক কাজকর্মের নামে বা বিভিন্ন আঙ্গিকে বক্ষ-পেটিকা-নিতম্ব প্রদর্শনীই মুখ্য। রীল এখন ব্যক্তিগত সফট পর্ণের আঁতুড়ঘর।
 
    তবে সিনেমা সিনেমাই। সিনেমার কোনো বিকল্প নেই। ভালো মানুষ, ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী, ভালো পরিচালক প্রডিউসার এখনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আছে। তাই এখনও ভালো ভালো কাজ হচ্ছে। তার অনেকগুলি আবার বিশ্বমানের।  তবে ফ্রড স্ক্যাম র‍্যাকেট বা দালাল চক্র সব জায়গায় মত এখানেও আছে, বরং বেশি আছে। এদের ফাঁদে না পড়াটা নতুন ছেলেমেয়েদের কাছে এখন একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। 
 
    বড় পর্দায় হোক বা টিভি সিরিয়ালে, সুযোগ পেতে গেলে গেলে আগে অভিনয়টা জানতে হবে। শিখতে হবে। অসীম ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকতে হবে। অনেক কিছু হারাতেও হবে। পড়তে হবে এক ভয়ংকর অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে। 
 
    কাজের চাইতে আর্টিস্ট এখন অনেক বেশি। সুতরাং একজন 'না' বললে অন্য বহুজন সেই কাজটি করার জন্য রেডি হয়ে আছে। কার্যত বাধ্য হয়েই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই কাজটি করতে হচ্ছে, টাকা দিয়েই হোক বা কম্প্রোমাইজ করেই হোক। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এ এক অদ্ভুত সংকট। 
 
    আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সিনেমায় অভিনয় কিন্তু 'ভিনি ভিডি ভিসি' নয়। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম, আর সুপারস্টার হয়ে গেলাম -এটা এক মিথ্যে মিথ। অন্য সব ক্যারিয়ারের মতই অনেক মেহনত, দীর্ঘ লড়াই আর অনেক স্যাক্রিফাইসের গল্প গ্ল্যামার জগতের সাফল্যের পরতে পরতে। 
ক্রমশঃ...
রোহান গামা মীর

রোহান গামা মীর

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।