সিঙ্গুলারিটি : কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও এক ঈশ্বর
দৃশ্যত সীমাহীন মানুষী মেধা, বুকে কাঁপন ধরানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অচেনা বহির্জাগতিক অতিবুদ্ধি (এক্সট্রাটেস্টোরিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ও মহাজগতিক প্রভুত্ব নিয়ে প্রতিদিন মাথা গুলিয়ে দেওয়ার মতো নতুন নতুন দর্শনতত্ত্ব যখন চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে, বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা ছাড়িয়ে বিজ্ঞান নির্ভর গাল-গল্প যখন ঈশ্বর ধারণাকে যখন ধন্দে ফেলে দিয়েছে, তখন কিছু নিশ্চিত অনিবার্য প্রশ্ন একান্তে আমাদের ভাবনার ধারণাগুলিকে বিচলিত করে।
'ঈশ্বর কি' 'ঈশ্বরের সিঙ্গুলারিটি বা এককতা কি গ্রহণযোগ্য' 'ঈশ্বর কি নিছকই বিশ্বাস নাকি যৌক্তিকও' ঈশ্বর কি আসলে একটি নিরাকার অ্যাবস্ট্রাক্ট চেতনা ? নাকি একটি নৈতিক-আধ্যাত্মিক ধারণা ? এই প্রশ্নগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই আর।
প্রথাগত ভাবনায় ঈশ্বর সম্পর্কে যে ছবিটি প্রাথমিকভাবে আমাদের মাথায় আসে সেটি হল- ঈশ্বর একটি অনাদি, অনন্ত, অসীম, শাশ্বত অস্তিত্ব যা অবিনশ্বর। পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলিও এককথায় এই ধারণাকে সমর্থন করে।
প্রাচীন বৈদিক ধর্মে ঈশ্বর সম্পর্কে বলা হয়েছে "একং সৎ বিপ্ৰা বহুধা বদন্তি" (ঋকবেদ ১.১৬৪.৪৬) অর্থাৎ রূপ বিভিন্ন হলেও সত্য একটাই। ছান্দোগ্য উপনিষদে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে "একম ব্রহ্ম দ্বিতীয় নাস্তি" (একমাত্র ব্রহ্মই সত্য) ব্রহ্ম "একম এব অদ্বিতীয়ম" এবং "নিরঞ্জন" (নিরাকার) ব্রহ্ম শব্দের অর্থ পরম সত্য। বেদ উপনিষদের আলোচনা ও ব্যাখ্যাগুলি সার্বিকভাবে জন্ম মৃত্যুহীন শাশ্বত, এক এবং একমাত্র নিরাকার ঈশ্বরের ধারণা দেয়।
প্রাচীন পারসিকদের জরাথুস্ট্রীয় ঈশ্বর আহূরা মাজদা (পরমজ্ঞানী প্রভু) সম্পর্কে বলা হয়েছে ঈশ্বর যিনি পরম জ্ঞানী তার জন্ম মৃত্যু নেই যাকে কখনো সৃষ্টি করা হয়নি এবং যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
"তাকে আমি প্রশ্ন করলাম হে প্রভু আমাকে বলো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ামক কে" (জেন্দ-আবেস্তা / য়াস্না ৩১.৮) এবং উত্তর হল 'আহুরা মাজদা'। এখানেও পারসিক ধর্মও এক এবং একেশ্বরবাদের ধারণা দেয়।
প্রাচীন ইহুদি ধর্মেও হিব্রু তোরা -তে একেশ্বর বাদের পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়েছে।"হে ইস্রায়েল, শোন, সদাপ্রভু আমাদের ঈশ্বর, সদাপ্রভু এক।" (তোরা / দিউতারোনোমি ৬:৪)
খ্রিস্টান ধর্মেও বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে "আমি সদাপ্রভু, আর অন্য কোন ঈশ্বর নেই; আমার ছাড়া আর কেউ ঈশ্বর নয়।" (ওল্ড টেস্টামেন্ট /ইসাইয়া ৪৫:৫) এবং “আমরা জানি, মূর্তি জগতে কিছুই নয় এবং এক ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ নেই।” (নিউ টেস্টামেন্ট / করিন্থীয় ৮:৪)
ইসলামে একেবারে স্পষ্টভাবে জন্ম মৃত্যুহীন শাশ্বত একেশ্বরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। "১.বল, তিনিই আল্লাহ, একমাত্র। ২. আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।৩. তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। ৪. এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।" (আল কুরআন / সুরা আল-ইখলাস ১১২:১–৪)
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় কাঠামো আলাদা হওয়া সত্ত্বেও আব্রাহামিক বা নন-আব্রাহামিক সকল অরিজিনের স্ক্রিপচারগুলির সবকটিতেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্তা হিসেবে জন্ম-মৃত্যুহীন এক শাশ্বত অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এখনও পর্যন্ত ঈশ্বর সম্পর্কিত সমস্ত তথ্যই ব্যক্তিগত বিশ্বাস নির্ভর, প্রচলিত বিজ্ঞানের নিরিখে প্রমাণিত নয়। কিন্তু, হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক ভাবেই প্রমাণিত হতে চলেছে যে ঈশ্বর এক ও একমাত্র এবং তিনি সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের একক সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্তা। হয়তো তখন আর বিজ্ঞান ও বিশ্বাসে কোন দ্বন্দ্ব থাকবে না, বিজ্ঞান ও বিশ্বাস হয়ে উঠবে একে অপরের পরিপূরক।
অজানাকে জানার অকুন্ঠ প্রয়াস ও বিশেষ জ্ঞানের অনুসন্ধান চিরকালই বিজ্ঞানকে ভাবিয়েছে। মহাজাগতিক রহস্য সন্ধান বা অতিজাতিক বুদ্ধিমত্তার সন্ধান সেই ভাবনাকে বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে অনেকটাই। মানুষের দেখা বা অদেখা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষই একমাত্র যে একমাত্র বুদ্ধিমান চেতনা (consciousness) এ তথ্য খারিজ হয়ে গেছে সেই কবেই।
সেই জায়গায় এসেছে কিছু মজার বৈজ্ঞানিক ধারণা। আমরা অল্প বিস্তার সবাই জানি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বস্তুগতভাবে (materialistic) জীবিত বা জড় – সবকিছুই গঠিত হয়েছে অণু (molecule) ও পরমাণু (atom) দিয়ে। এই অনু পরমাণু গুলির ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর কনাগুলির (particles) নিয়ম ও অনিয়ম নিয়ে যে জগত সেটাই পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় কোয়ান্টাম ওয়ার্ল্ড বা কোয়ান্টাম জগত। এই জগতের নিয়মগুলোকে বলা হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্স যা প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের থেকে একেবারেই আলাদা।
দ্বৈত প্রকৃতি ডুয়েল ক্যারেক্টার (wave particle duality), অনিশ্চয়তা নীতি (Heisenberg's Uncertainty Principle), সহাবস্থানিক চরিত্র (superposition), একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকতে পারা (entangliment) এগুলি কোয়ান্টাম জগতের বৈশিষ্ট্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। আধুনিক কম্পিউটার চিপ,লেজার প্রযুক্তি, MRI (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং), কোয়ান্টাম কম্পিউটার -এগুলি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ফসল।
আধুনিক কোয়ান্টাম থিওরির ধারণা দেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্ক। বিজ্ঞানী নীলস বোর পরমাণুর গঠন বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। পরে বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ শ্রোডিংগার ও ডিয়ার্ক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে সম্পূর্ণতা দেন।
এই কোয়ান্টাম মেকানিক্স যে কোয়ান্টাম জগতের কথা বলে সে জগত আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি একটি সম্ভাবনার জগত যেখানে নিশ্চিতের চেয়ে সম্ভাব্যতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঈশ্বর ও সৃষ্টি সম্পর্কিত ধারণাতে এখানেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাসঙ্গিকতা। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বৈজ্ঞানিকভাবে গণনাযোগ্য এবং পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণিত বিজ্ঞানের একটি শাখা হওয়া সত্ত্বেও এক ধরনের ডিলিউশন বা বিভ্রমের কথা বলে যেটির সঙ্গে প্রধান প্রধান ধর্ম গুলির দর্শন তত্ত্বের একটা অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। যেমন বাস্তব বলে আমরা যেটিকে ভাবি সেটি আসলে বাস্তব না ও হতে পারে। হয়ত প্রকৃত বাস্তবের স্বরূপ সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের নিজস্ব চেতনার পর্যবেক্ষণে আপাত দৃশ্যমান বাস্তব কে আমাদের মত করে বাস্তব বলে মনে করি আমরা।
প্রায় সমস্ত মূল ধর্মেরই দার্শনিক ব্যাখ্যায় এই জগতকে আমাদের বস্তুগত বোধের বিভ্রম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাহলে কি আমরা বাস করছি এক পরাবাস্তব (surreal) জগতে ? আমাদের পারিপার্শ্বিক আমাদের চিন্তাভাবনার আমাদের বোধ অনুভূতি এগুলো কি আসলেই এক ধরনের বিভ্রম ?
প্রাচীন বৈদিক ধর্মীয় দর্শনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে "এই মায়া (মোহ, বিভ্রম) আমার সৃষ্টি, যা তিনটি গুণ (সত্ত্ব, রজ, তম) দ্বারা গঠিত এবং অতীব দুর্জয়। তবে যারা শুধুমাত্র আমার শরণ নেয়, তারা এই মায়া পার হয়ে যায়।" (শ্রীমৎভগবত গীতা ৭:১৪)
"মায়া বিহিতং দ্বৈতম্" যার অর্থ "দ্বৈত বা বিচিত্র জগত মায়া দ্বারা সৃষ্টি।" (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২.৫.১৯) অর্থাৎ এই জগত আসলে সত্য নয়, এক ধরনের মিথ্যা মায়া, বিভ্রম। সুতরাং এ জগতে মানুষ বাস করে এক পরা বাস্তবের মধ্যে এমনটাই বলা হয়েছে বলে মনে হয়।
প্রাচীন জরাথুস্ট্রীয় পারসিক ধর্মদর্শনে উল্লেখ রয়েছে "দুটি আদিপ্রাণ— একজনে বেছে নেয় জীবন (সত্য, আলো, সৃজন), অন্যজনে বেছে নেয় অজীবন (মিথ্যা, অন্ধকার, ধ্বংস)।এই দুই পথের মধ্যে জ্ঞানীরা সঠিক পথটি বেছে নেয়, আর অজ্ঞ, মূর্খরা বিভ্রান্ত হয় ও ভুল পথে যায়।" (জেন্দ-আবেস্তা / য়াস্না ৩০:৩–৫) এই জগতে প্রচুর মিথ্যা ও বিভ্রান্তি রয়েছে, যা আত্মার প্রকৃত গন্তব্য (আহুরা মাজদার সত্যজগত) থেকে দূরে রাখে। এতে স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে এই জগতে মানুষ বাস করে এক বিভ্রান্তিময় পরাবাস্তবে।
ইহুদি ধর্মের মূল গ্রন্থ তানাখ বা হিব্রু বাইবেল অনুযায়ী “অর্থহীনতার পরম অর্থহীনতা, সবই অর্থহীন।” (তানাখ / কোয়হলেত ১:২) ইহুদি 'কাব্বালার' প্রধান গ্রন্থ: জোহার-এ বলা হয়, ইহজগত হল 'ওলাম হা-সেকের' অর্থাৎ, মিথ্যার জগৎ, যেখানে আত্মা বিভ্রান্ত হয় ও বাস্তব সত্যকে দেখতে পায় না। এখানেও দেখা যাচ্ছে ইহজগতকে এক বিভ্রান্তিময় পরাবাস্তবের মতো ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
খ্রিস্টীয় ধর্মদর্শনে “যা চোখে দেখা যায়, তা সাময়িক; আর যা চোখে দেখা যায় না, তাই চিরন্তন।” (নিউ টেস্টামেন্ট কোরিয়ানস ৪:১৮) "মানুষ যেন এই জগতের মোহ ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে না মিলিয়ে ফেলে, বরং আত্মিক রূপান্তর ঘটিয়ে ঈশ্বরের ইচ্ছা বোঝে — কারণ এই জগত একটি বিভ্রান্তি।" (নিউ টেস্টামেন্ট রোমানস ১২:২) খ্রিস্টীয় ধর্ম দর্শন অনুযায়ীও মানুষ বাস করে এক পরাবাস্তব জগতে এ ধারণা স্পষ্ট।
ইসলামীয় ধর্মদর্শনও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে উল্লেখ রয়েছে "এই দুনিয়ার জীবন কেবল খেলা ও কৌতুক। আর আখিরাতই হচ্ছে প্রকৃত জীবন -যদি তারা জানত!" (আল কুরআন- সূরা আনআম ৬:৩২) , "এই দুনিয়ার জীবন তো কেবল ক্রীড়া ও কৌতুক; আর আখিরাতই প্রকৃত জীবন-যদি তারা বুঝত!" (আল কুরআন-সূরা আনকাবূত ২৯:৬৪)
তাসাউফ (Sufism) বা ইসলামের এক আধ্যাত্মিক শাখায়, দুনিয়া বা ইহজগৎকে অনেক সময় "হিজাব" (আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের অন্তরায়) বা "ধোঁকার চাদর" হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইহ জগতে মানুষ এক পরাবাস্তবে বাস করে যেটা তার প্রকৃত বাস্তব জগৎ নয়।
এই পরাবাস্তব হল প্রকৃত বাস্তব জগতের বাইরে একটি বিভ্রমের জগত যেটিকে তাৎক্ষণিক চেতনায় বাস্তব বলে মনে হয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্সও এমন- দৃশ্যত একইরকম কিন্তু চরিত্রগতভাবে বহুমাত্রিক এমন এক বিভ্রান্তিময় অবস্থার কথা বলে, আমাদের বস্তুগত চেতনা যেখানে আধ্যাত্মিক চেতনা থেকে হাজার যোজন দূরে অবস্থান করে। এ যেন এক অতিমাত্রিক (superdimentional) কোয়ান্টাম জগত।
সত্যিই কি পার্থিব চেতনা (consciousness) নিয়ে এই পৃথিবীতে মানুষ আসলে এক পরাবাস্তব বিভ্রমের ভেতর বাস করে ? আমরা যে বস্তুগতভাবে গ্রাহ্য বিষয়গুলিকে একমাত্র বাস্তবতা ভাবি, তা হয়তো একটা তরঙ্গমাত্র, বাস্তবতার ছায়া হয়তো বা। যেখানে বহু মহাবিশ্ব, বহু সম্ভাবনা একসাথে বিদ্যমান, শুধুমাত্র আমরা কোনটা উপলব্ধি করছি তার ওপর নির্ভর করে সবকিছু ? কার মস্তিষ্কপ্রসূত এত বিশাল জটিল অংক যা মিলানো মানুষের অসাধ্য ? মানুষের চাইতে আরো বুদ্ধিমান কেউ ?
কোয়ান্টাম জগতের সূক্ষ্মতা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালতা বিজ্ঞানীদের এমন একটি ধারণার সম্মুখীন হতে বাধ্য করে যে, পৃথিবী-ই একমাত্র বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্র এটা বলার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
এবং ঠিক সেই কারণেই বিজ্ঞানীরা বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তা (extraterrestrial intelligence) নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেন। একসময় বহির্বিশ্বের বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি ও উন্নতির স্তর মাপার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত প্যারামিটার বা স্কেল তৈরীর কাজে হাত দেন।
১৯৬৪ সালে রাশিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাই কার্দাসেভ একটি ধারণা দেন যে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের বুদ্ধিমান সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনগুলির শ্রেণীবিন্যাস করা যায় তাদের শক্তি (এনার্জি) ব্যবহার করার ক্ষমতার ভিত্তিতে। পরে এই প্যারামিটারে এনার্জির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণেরও ক্ষমতা যুক্ত হয়। কোন সভ্যতা কতটা এনার্জি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার ভিত্তিতে কোন সভ্যতা কতটা বুদ্ধিমান সেই শ্রেণিবিন্যাস করতে পারার ধারণাটি তত্ত্বগতভাবে বিজ্ঞানসম্মত বলে সর্বজনগ্রাহ্য হয়।
প্রাথমিকভাবে কার্দাসেভ স্কেলে সম্ভাব্য বুদ্ধিমান সিভিলাইজেশন গুলিকে তিনটি স্তর ও পরে আরো চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। টাইপ ১, টাইপ ২, টাইপ ৩, টাইপ ৪, টাইপ ৫, টাইপ ৬ ও টাইপ ৭ ।
টাইপ-I (Planetary Civilization) : কোন সিভিলাইজেশনের বুদ্ধিমত্তা তাদের নিজস্ব গ্রহ ও পরিমণ্ডলের উৎস গুলি থেকে উপলব্ধ সমস্ত এনার্জি সংগ্রহ, ব্যবহার ও বস্তুগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বুঝতে হবে সেই সিভিলাইজেশন টাইপ-I এ পৌঁছেছে।
টাইপ-II (Stellar Civilization) : নিজস্ব গ্রহের ও পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলের উৎসগুলি থেকে পাওয়া এনার্জি যখন আর পর্যাপ্ত হবে না তখন এই সভ্যতার বুদ্ধিমত্তারা একই সৌরমন্ডলের আশেপাশের গ্রহ ও নক্ষত্রগুলি থেকে (ডাইপারসন স্ফীয়ার পদ্ধতিতে)* এনার্জি সংগ্রহ ও আন্তগ্রহ নক্ষত্র কে বস্তুগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
টাইপ-III (Galactic Civilization) : নিজস্ব সৌরমন্ডলের সমস্ত এনার্জি উৎস গুলি নিঃশেষ করে এই সভ্যতার বুদ্ধিমত্তারা অন্য সৌরমন্ডল ছাড়িয়ে ভিন্ন গ্যালাক্সির উৎস গুলি থেকে এনার্জি সংগ্রহ করবে এবং গ্যালাক্সিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সিতে অবাধ যাতায়াত, এনার্জি সংগ্রহ, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ হল এই সিভিলাইজেশনের বুদ্ধিমত্তাগুলির বৈশিষ্ট্য। এদের হাতেই থাকবে আন্তগ্যালাক্সীয় বস্তুগত নিয়ন্ত্রণ।
টাইপ-IV (Universal Civilization) : এই সভ্যতায় পৌঁছালে বুদ্ধিমত্তারা গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত এনার্জি ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাকহোল থেকে এনার্জি সংগ্রহ এবং উৎসগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ব্যবহার করতে পারবে ডার্ক ম্যাটারকে। নক্ষত্র সৃষ্টি ও ধ্বংস করতে পারবে এই সিভিলাইজেশনের বুদ্ধিমত্তারা। সময়-অবস্থানকেও (time dimention) নিয়ন্ত্রণ করার মতো পর্যায়ে পৌঁছে যাবে সিভিলাইজেশন।
টাইপ-V (Multiversal Civilization): এই সিভিলাইজেশনের বুদ্ধিমত্তারা ভিন্ন টাইম ডাইমেনশনে থাকা প্যারালাল ইউনিভার্স গুলি থেকে এনার্জি সংগ্রহ ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করবে। বহুমাত্রিক (multi dimentional) ইউনিভার্স সৃষ্টি ও ধ্বংস করতে পারবে। জয় করবে পরিচিত ও অপরিচিত ফিজিক্সের সমস্ত নিয়ম ও অনিয়মকে। সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বহুমাত্রিক (multi dimentional) বাস্তবতাকেও।
টাইপ-VI (Transcendent Civilization) : প্রযুক্তিগতভাবে এই বুদ্ধিমতারা হলো সর্বজ্ঞ। প্রায় ঈশ্বর সদৃশ প্রযুক্তিগত ক্ষমতা এই সভ্যতার বুদ্ধিমত্তাদের। সমস্ত নিয়ম-নীতির উর্ধ্বে উঠে এই সভ্যতার বুদ্ধিমত্তারা আক্ষরিক অর্থেই 'সবকিছু' কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তো বটেই প্রযুক্তিগতভাবে সময় সম্পর্কিত ধারণার (time dimention) বাইরে বেরিয়ে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করবে এই সিভিলাইজেশনের বুদ্ধিমত্তরা।
আগের ছয়টি সিভিলাইজেশনের চূড়ান্ত হল টাইপ ৭ ।
টাইপ-VII (Omega Civilization) : এই সিভিলিজেশন সমস্ত ধরণের বুদ্ধিমত্তার এক চূড়ান্ত একীভূত রূপ। সময়, বাস্তবতা, সৃষ্টি, ধ্বংস, পুনঃলিখন (future re-programming/over-write) -চেতনার চূড়ান্ত, অখণ্ড, অনন্ত রূপ এই বুদ্ধিমত্তা। একটি সত্ত্বা যা সমস্ত স্তরের বাস্তবতা, পদার্থ, চেতনা, সময়, মহাবিশ্ব, বহুবিশ্ব, ব্রহ্মাণ্ড এবং এগুলির অস্তিত্বের ধারণাকেও সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ, ধ্বংস ও পুনর্লিখন (re-write/re-program) করতে সক্ষম।
সম্পূর্ণ অমূর্ত, তরঙ্গীয়, অথবা কোয়ান্টাম-চেতনার চূড়ান্ত। এটাই সভ্যতার শেষ স্তর। টাইপ-VI সিভিলাইজেশন প্রযুক্তিনির্ভর হলেও এই টাইপ-VII বা ওমেগা সিভিলাইজেশন একেবারেই প্রযুক্তি-নির্ভর নয় বরং চেতনা, উপলব্ধি ও সৃষ্টিশক্তির পরম রূপ।

এবং সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হল এই সভ্যতার বুদ্ধিমত্তা হবে বিজ্ঞানের ভাষায় 'সিঙ্গুলারিটি' বা একক। যে বুদ্ধিমত্তা নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করে, নিজেকে জানে, এবং নিজেই ঈশ্বর হয়ে ওঠে। ঠিক এখানে এসে একাকার হয়ে যায় ধর্মীয় দর্শনের একেশ্বরবাদ ও বৈজ্ঞানিক দর্শনের সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব।
এই সমস্ত ধারণা এবং প্রতি-ধারণা যে আসলে আপেক্ষিক, কালকের অসম্ভবকে আজকের সম্ভবে পরিণত করে বিজ্ঞান তা বার বার প্রমাণ করেছে। আজকের অসম্ভব কখনোই কালকের সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনা। হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে আজকের তাত্ত্বিক ধারণা কালকের প্রায়োগিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।
এই আলোচনা প্রসঙ্গে আরেকটি মজার তত্ত্বের কথা উল্লেখ না করলেই নয়।
বিশ্ব বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী, অ্যানালিটিক্যাল সাইকোলজির প্রতিষ্ঠাতা কার্ল জং ও নোবেল জয়ী কোয়ান্টাম পদার্থবিদ ওল্ফগাং পাওলি ১৯৪৬ সালে ‘সাইকো-ফিজিকাল প্যারালালিজম’ (একটি মতবাদ যা মনের চেতনা ও দেহের ভৌত সম্পর্ক নিয়ে বলে) নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং 1952 তে 'The Interpretation of Nature and the Psyche' নামের বইয়ে তাদের যৌথ তত্ত্ব 'The Interpretation of Nature and the Psyche' প্রকাশ করেন।
এই বইয়ে জং ও পাউলি তাদের যৌথ তত্ত্বের মাধ্যমে প্রথম ধারণা দেন যে নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং মহাবিশ্বের কাঠামো একই গাণিতিক প্যাটার্ন অনুসরণ করে সুতরাং মস্তিষ্কের গঠন ও মহাবিশ্বের গঠনের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ থাকতে পারে।
এর অনেক পরে ফ্রাঙ্কো ভাজা এবং অ্যালবার্টো ফেলেটি নামের দুজন বিজ্ঞানী যৌথভাবে মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং মহাবিশ্বের কসমিক ওয়েব (Cosmic Web) এর মধ্যে আশ্চর্যরকম সাদৃশ্য নিয়ে গবেষণা করেন। তারা সেরিব্রাল কর্টেক্সের সর্বোচ্চ স্তরের মাইক্রোস্কোপিক ইমেজ অ্যানালিসিস করে এবং একইসঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের টেলিস্কোপিক ইমেজ এনালিসিস করে দেখেন দুটিরই গঠনের প্যাটার্ন সম্পূর্ণ একইরকম।
এ বিষয়ে তাদের গবেষণা 2020 সালে 'Frontiers in Physics' জার্নালে "The Quantitative Comparison Between the Neuronal Network and the Cosmic Web" শিরোনামে প্রকাশিত হলে বিজ্ঞান মহল নড়েচড়ে বসে। তারা দেখান যে নিউরোন ও ব্রহ্মাণ্ড দুটিরই গঠনগত, ধরনরগত ও আদান-প্রদানগত কাঠামো একই রকম। তখন থেকে 'নিউরোকসমোলজি' বা 'মহাবিশ্ব একটি বিশাল মস্তিষ্ক' ধারণার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যুক্তিগ্রাহ্য হতে শুরু করে।
নিউরনের শাখা-প্রশাখা অর্থাৎ ডেনড্রাইটগুলি এবং কসমিক ওয়েবের মহাকর্ষীয় ফিলামেন্ট গুলি উভয়ই ফ্র্যাক্টাল প্যাটার্ন (একটি জ্যামিতিক আকৃতি যার একটি ছোট অংশও পুরো আকৃতির মতো দেখতে) অনুসরণ করে, ভাজা ও ফেলেটির গবেষণা থেকে গাণিতিকভাবে সেটি প্রমাণিত হয়।
নিউরোনের কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক সিস্টেম এবং কসমিক ওয়েবের (মহাবিশ্বের গ্যালাক্টিক নেটওয়ার্ক) কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক সিস্টেম পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যগতভাবে আলাদা হলেও কাঠামোগতভাবে একই ধরনের। নিউরনগুলো ইলেকট্রিক্যাল এবং কেমিক্যাল সিগন্যাল (নিউরোট্রান্সমিটার) এর মাধ্যমে 'সিন্যাপস' নামে এক ধরনের কানেকশন পয়েন্ট ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগের মাধ্যমে সক্রিয় থাকে। কসমিক ওয়েবও মহাকর্ষীয় বল (গ্রাভিটি) এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ (আলো, রেডিও ওয়েভ ইত্যাদি) এর মাধ্যমে একে অপরের সাথে নিরন্তর যুক্ত থাকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের চেতনা (consiousness) আমাদেরকে জীবিত উপলব্ধি করায়। তাহলে কি কসমিক ওয়েবেরও মানুষের অপরিচিত নিজস্ব কোন চেতনা (consiousness) আছে ? নাকি সবটাই এক ধরনের সিমুলেশন ? সিমুলেশন হলো একটি কৃত্রিম চেতনাময় বিশ্ব যাকে প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাস্তবের মতো করে তৈরি করা হয় ও প্রজেক্ট করা যায়। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের জগতের সঙ্গে এর অনেকটা সাদৃশ্য আছে।
তাহলে কি আমরা ঈশ্বরের ভাবনার হলোগ্রাফিক ইমেজ ? এক জীবন্ত চেতনা সম্পন্ন পরাবাস্তব ? কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিভিন্ন তত্ত্ব আজ আমাদেরকে এই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক ভিন্ন ঈশ্বর-জিজ্ঞাসার সামনে। যেখানে ঐশ্বরিকতা ও বৈজ্ঞানিকতায় কোন দ্বন্দ্ব নেই।