সংগৃহীত

অথবা পুরুষ মানুষ

দ্য স্ক্রল সংগ্রহ
দ্য স্ক্রল সংগ্রহ 30 May, 2026
৪৪৪

নারীর স্তন দেখতে ভালো লাগে? আমার তো লাগতো।

     ছেলেবেলায়, আমার যৌন কল্পনায় নারীসৌন্দর্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি ছিল বাসনাসিক্ত সুডৌল বক্ষযুগল।

      পুরুষ হয়ে জন্মেছিলাম, এ আকর্ষণ ছিল অমৌঘ অনিবার্য। কিন্তু পুরুষ থেকে মানুষ হতে শেখাল এক মায়ের শুকনো বুকের হাহাকার...

      একজন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন তো আপনি এর সাথে নিজেকে মেলাতে পারেন কিনা। 

    সত্যিটা স্বীকার করতে আজ আর কোনো গ্লানি নেই। বয়স যখন কম ছিল আমার পুরুষদৃষ্টিও পাপমুক্ত ছিল না। নারীর সৌন্দর্যের কথা ভাবলেই চোখে ভেসে উঠত তার শরীরের গভীর বুকের ভাঁজ।

      পুরুষমহলে আড্ডায় শোনা যেত মেয়েদের আসল সৌন্দর্য নাকি ওখানেই।

      আজ ভাবতেই চমকে ওঠি। তখন বুঝতাম না, মাংসপিণ্ডের ওই আকার বা আকৃতির নিচে কী বিশাল এক মহাসমুদ্র লুকিয়ে থাকে। সে সময় দৃষ্টি তখনও চামড়া ভেদ করে আত্মার নাগাল পায়নি।

      কিন্তু সৃষ্টিকর্তা হয়ত চেয়েছিলেন আমার এই 'পুরুষত্ব'র দৃষ্টি ভেঙে 'মনুষ্যত্ব'র বাস্তবতা দেখাতে। হয়তো তাই মুখোমুখি হয়েছিলাম এমন এক দৃশ্যের যা দেখার পর আমি আর আগের আমি থাকিনি।

      সময়টা চৈত্র মাসের কাঠফাটা দুপুর। গ্রামবাংলার আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছে। মাটি ফেটে চৌচির। ধুলোবালি ওড়া এক মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তৃষ্ণায় আমার গলা শুকিয়ে কাঠ।

      হঠাৎ সেই পাথুরে পথের ধারে চোখে পড়ল এক জরাজীর্ণ গাছে হেলান দিয়ে সন্তান হলে বসে আছেন ততোধিক জীর্ণ এক মা।

      বয়স কত হবে? পঁচিশ? ছাব্বিশ? কিন্তু অভাব, দারিদ্র্য আর অপুষ্টি সমস্ত যৌবন শুষে নিয়ে মুখে এঁকে দিয়েছে পঞ্চাশ বছরের বার্ধক্য। 

      গায়ের ব্লাউজটা শতছিন্ন, শাড়ির আঁচলটা খসে পড়েছে কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার তার কোন অবসর বা আগ্রহ নেই। তার কোলে শুয়ে আছে এক হাড়জিরজিরে শিশু।

      আমি থমকে দাঁড়ালাম। দৃশ্যটা আমাকে নড়তে দিল না।

      বাচ্চাটা কাঁদছে না। কান্নার শক্তিও হয়ত নেই তার। সে শুধু প্রাণপণ শক্তিতে মায়ের বুকটা কামড়ে ধরে চুষছে।

      কিন্তু হায়! সেই বুকে কি এক ফোঁটা দুধ আছে ?

      মায়ের শরীর নিজেই তো এক কঙ্কাল। বুকের হাড়গুলো গোনা যাচ্ছে। চামড়ার নিচে শুধুই হাহাকার।

      তবুও অবুঝ শিশুটি চুষেই যাচ্ছে...চোক... চোক...

      এক অদ্ভুত করুণ শব্দ। যেন শুকনো নদী থেকে শেষ বিন্দু জলটুকু নিংড়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা কেউ।

     আমি স্পষ্ট দেখছিলাম দুধ নয়, শিশুটি চুষছে মায়ের বুকের রক্ত-মাংস-অস্থিরস। মায়ের দু চোখ পাথরের মত স্থির। কিন্তু সেই পাথর চুইয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

     ফোটা ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে বাচ্চাটার কপালে, গালে, ঠোঁটে। বাচ্চাটা হয়তো সেই নোনা জলই চেটে খাচ্ছে। হয়ত ভাবছে, এটাই দুধ। এটাই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া প্রাণ রস।

     বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আমার এতদিনের সব নোংরা কল্পনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।

      মায়ের ওই নীরব চাহনি যেন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলছিল "ভগবান! আমার বুকের মাংস গলে রক্ত দে, তবুও আমার বাচ্চার পেটে দু’ফোটা আহার দে... আমি যে মা! আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না!"

      আমি সেদিন পালিয়ে এসেছিলাম। হ্যাঁ, কার্যত আমি পালিয়েছিলাম। সেই দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না।

      কিন্তু সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। কানে শুধু বাজছিল সেই 'চোক চোক' শব্দ আর চোখে ভাসছিল মায়ের সেই শুকনো বুক।

      সেদিন বুঝেছিলাম, নারীর বুক কোনো কামনার লালসার ভোগের বস্তু নয়। এটি কোনো বাসনার নীলাক্ষেত্র নয়— বাস্তবে সেটি একটি যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে একজন নারী নিজের শরীরের সবটুকু নির্যাস দিয়ে তিলে তিলে বড় করে তোলে আগামীর পৃথিবী। যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু দেওয়া, কোন বিনিময় নয়।

      আজ যখন দেখি আমার সন্তান তার মায়ের বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমায়, যখন দেখি খিদে পেলেই সে হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের বুকের কাছে আশ্রয় খোঁজে তখন আমার চোখে জল আসে।

      মনে হয়, এই বুকের নামই "নিরাপত্তা"। এই বুকের নামই "পৃথিবীর শেষ আশ্রয়স্থল"।

হে পুরুষ!

রাস্তায় ঘাটে কোনো নারীর শরীরের ভাঁজ খোঁজার আগে একবার এই ছবিটির কথা ভেবো। তুমিও একদিন ওই বুকের রস খেয়েই বড় হয়েছ। ওই বুক শুধুই একটি মাংসের দলা নয়, ওটা তোমার প্রথম মন্দির।

      নারীর বুক দেখে উত্তেজনা নয়, বরং শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে শেখ। নারী তার শুকনো বুক দিয়েও সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধ করে যায়। তাদের শরীরের প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে থাকে একেকটি ত্যাগের মহাকাব্য।

      নারীর সৌন্দর্য তার কামনাসিক্ত শরীরে নয়, নারীর সৌন্দর্য তার মমতায়, তার ত্যাগে, তার আঁচলের মায়ায়।

      যেদিন এটা বুঝবে, সেদিন দেখবে—পৃথিবীর সব নারীকেই মায়ের মতো পবিত্র মনে হচ্ছে।

      সেই অচেনা মায়ের শুকনো বুক একজন পুরুষকে মানুষ বানিয়েছে। পুরুষ থেকে পশু হয়ে যাওয়ার চাইতে পুরুষ থেকে মানুষ হতে পারাটা আজ ভীষণ জরুরী।

দ্য স্ক্রল সংগ্রহ

দ্য স্ক্রল সংগ্রহ

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।